Skpaul

For HumanKind

আদালত ভুল স্বীকার করলেন, রাজনীতিকেরা করবেন কি?

আদালত ভুল স্বীকার করলেন, রাজনীতিকেরা করবেন কি?

সোহরাব হাসান | তারিখ: ৩১-০৭-২০১০, Prothom Alo

সংবিধানের মৌল নীতি বা কাঠামো নিয়ে ৩৯ বছর ধরে যে বিতর্ক ও বিরোধ চলে আসছিল, মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ে তার অবসান হবে কি না, সে প্রশ্নের উত্তর একমাত্র ভবিষ্যৎই দিতে পারে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ-দুর্বিপাকের মতো রাজনৈতিক দুর্যোগ-দুর্বিপাকও সাধারণ মানুষকে যেমন নিয়ত উদ্বিগ্ন রাখে, তেমনি দেশের অগ্রযাত্রাকেও করে ব্যাহত।
বাংলাদেশে সবকিছু ঘটে আকস্মিক ও অস্বাভাবিক কায়দায়। বাহাত্তর সালে যখন নব আনন্দে নতুন দেশ গড়ার মহান ব্রত নিয়ে সুমহান সংবিধান প্রণীত হয়েছিল, তখন কেউ ভাবতেও পারেনি যে ২৬ মাসের মাথায় তার খোলনলচে পাল্টে দেওয়া হবে। কায়েম হবে একদলীয় শাসন। এ জন্য তৎকালীন শাসক দল না বিরোধী শিবিরের অতিবিপ্লবীরা বেশি দায়ী, সে বিতর্কে না গিয়েও যে কথাটি বলা প্রয়োজন তা হলো, এর দায় আমরা কেউ এড়াতে পারি না।
আবার ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠার সময়ও কারও ভাবনায় ছিল না, আট মাসের ব্যবধানে এ দেশে ঘটবে ইতিহাসের ঘৃণ্য হত্যাকাণ্ড, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের যিনি স্থপতি, তাঁরই রক্তে রঞ্জিত হবে মাটি, নিষিদ্ধ হবে তাঁর নাম। কারও ভাবনায় ছিল না, ঘাতকেরা এভাবে উল্লাসে ফেটে পড়বে, খলনায়কেরা সূর্যসন্তানের ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে। এ জন্য কি কেবল ‘উর্দি পরা ছয় মেজর’ই দায়ী? মনে হয় না। দুই মাস আগে ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে যাঁরা বাকশালে যোগদানের জন্য লম্বা লাইন দিয়েছিলেন, তাঁদেরই অনেকে ১৫ আগস্টের হত্যাযজ্ঞকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। জাতি হিসেবে, মানুষ হিসেবে কত ছোট আমরা!
পরের ইতিহাস ছিল রক্তাক্ত, বেদনাহত। ক্ষমতা গ্রহণের ৮১ দিনের মধ্যে ১৫ আগস্টের ক্যুদাতাদের পায়ের নিচের মাটি সরে যায়, দেশে-বিদেশে তাঁরা সমর্থন হারায়। ২ নভেম্বর যে খালেদ মোশাররফ সেনাবাহিনীতে চেইন অব কমান্ড প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দৃশ্যপটে আসেন, সাধারণ জওয়ানদের সমর্থনের অভাবে তাঁকেও বিদায় নিতে হয় ভারতীয় ক্রীড়নকের মিথ্যে অপবাদ নিয়ে। একাত্তরের রণাঙ্গনের সবচেয়ে সাহসী যোদ্ধাকে কারা এবং কেন হত্যা করল, আজও তা রহস্যাবৃত। কেউ দায়িত্ব স্বীকার করেনি, এমনকি সিপাহি বিপ্লবের তথাকথিত নায়কেরাও খালেদ মোশাররফের প্রশ্নটি সযত্নে এড়িয়ে যান। ৭ নভেম্বর কর্নেল আবু তাহের ও জিয়াউর রহমান যখন যৌথভাবে সিপাহি বিপ্লবের গৌরবের দাবি করেন, খোলা জিপে সেনাদের সতর্ক করে দিচ্ছেন দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র সম্পর্কে, তখন তাদের জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে সেনানিবাসে চলছিল অফিসার হত্যার পালা। নির্বিচার মানুষ হত্যা যদি বিপ্লব হয়, বাংলাদেশের মানুষ বহুবার তা প্রত্যক্ষ করেছে।
১৯৭৭ সালের গণভোটে জিয়াউর রহমানের হ্যাঁ বাক্সে যখন ৯৮ শতাংশ ভোট পড়ে, তখন কি কেউ ভাবছিলেন, তাঁকে রোজকেয়ামতের আগে কেউ ক্ষমতা থেকে নামাতে পারবে? যে সেনাবাহিনী তাঁর ক্ষমতার উৎস ছিল, সেই সেনাবাহিনীর একাংশ তাঁকে হত্যা করে ১৯৮১ সালের ৩০ মে। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ, যেদিন হুসেইন মুহম্মদ নামের এক সেনাপতি ক্ষমতা দখল করেন, সেদিন কি কেউ ভেবেছিলেন, ১০ বছর তিনি দেশ শাসন করতে পারবেন? কীভাবে পারলেন? পারলেন রাজনীতিকদের অনৈক্য ও সুবিধাবাদিতার কারণে। ১৯৯০-এ এক গণ-অভ্যুত্থানে তাঁকে বিদায় নিতে হয়। পৃথিবীর কোনো দেশে পরিত্যক্ত স্বৈরশাসকেরা রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে দাপট দেখাতে পারেন না। এরশাদ দেখাচ্ছেন। তাও রাজনীতিকদের কারণে। কখনো এ দল তাঁকে কাছে টানে, কখনো ও দল।
দুর্নীতি ও দুঃশাসনে পীড়িত মানুষ ক্ষমতার হাতবদলে খুশি হয়, স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। ভাবে, এবারে তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে। রাজনীতিকদের ভাগ্য বদল হয়, সামরিক-বেসামরিক আমলাদের ভাগ্য বদল, ব্যবসায়ীদের চেহারায় ঔজ্জ্বল্য ফিরে আসে। কিন্তু সাধারণ মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয় না।
সুপ্রিম কোর্টের এই ঐতিহাসিক রায় আগের, বর্তমান ও ভবিষ্যতের শাসকদের জন্য এক লালসংকেত হিসেবে চিহ্নিত হবে। এই রায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৬ এপ্রিল পর্যন্ত সব সামরিক ফরমান ও অধ্যাদেশকে অবৈধ ঘোষণা করেছেন। সুপ্রিম কোর্ট বলেছেন, কোনো অবস্থায়ই সামরিক শাসন জারি বা সংবিধান স্থগিত করা যাবে না। আদালত তিন ব্যক্তিকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন, খোন্দকার মোশতাক আহমদ, বিচারপতি মোহাম্মদ সায়েম ও জিয়াউর রহমান। তাঁরা প্রয়াত। তাঁদের বিচার করার সুযোগ নেই। কিন্তু আরেকজন সেনাশাসক এখনো জীবিত আছেন, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তিনি একনাগাড়ে সর্বাধিক সময় ক্ষমতায় ছিলেন। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ থেকে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর। আমরা যত দূর জানি, এরশাদের ক্ষমতা গ্রহণের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে একটি রিট করা হয়েছিল। সেটি আমলে নিয়ে মহামান্য আদালত আরেকটি ঐতিহাসিক রায় দিতে পারেন। সংবিধান লঙ্ঘনের দায়ে মোশতাক, সায়েম ও জিয়া অভিযুক্ত হলে এরশাদ ছাড়া পাবেন কেন? পঞ্চম সংশোধনী অন্তত একদলীয় শাসন থেকে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করেছিল। হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের রায়ে তা উল্লেখও করা হয়েছে। কিন্তু সপ্তম সংশোধনীতে এ ধরনের ভালো কাজের উদাহরণ নেই। বরং ১৯৮৮ সালে ভোটারবিহীন সংসদে এরশাদ গদি রক্ষার শেষ অবলম্বন হিসেবে রাষ্ট্রধর্ম বিল পাস করিয়েছিলেন। সামরিক আইন জারি ও সংবিধান সংশোধনের দায়ে পূর্ববর্তী তিন শাসক নিন্দিত হলে চতুর্থ শাসক নন্দিত হবেন কেন?
আদালতে পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করার বড় কারণ, সংবিধানের মৌল কাঠামো পরিবর্তন। রাষ্ট্রীয় চার মৌল নীতির অন্যতম ধর্মনিরপেক্ষতা। এর বাস্তবায়নের লক্ষ্যে মূল সংবিধানে সর্বপ্রকার সাম্প্রদায়িকতা, রাষ্ট্র কর্তৃক কোনো ধর্মের রাজনৈতিক মর্যাদা দান, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার, কোনো বিশেষ ধর্মপালনকারী শক্তির প্রতি বৈষম্য, তার ওপর নিপীড়ন বিলোপ করার কথা বলা হয়েছে (অনুচ্ছেদ-১২)। পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে এই ধারাটি বাতিল করা হয়েছিল। সপ্তম সংশোধনীতে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এর অর্থ, অন্যান্য ধর্মাবলম্বী দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক এবং তারা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পাবে না। এ ধরনের আইন যেমন বৈষম্যমূলক তেমনি মানবতাবিরোধীও। এ আইন বহাল রেখে বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়।
আদালত এই রায়ের মাধ্যমে কেবল সামরিক শাসনকেই অবৈধ বলে চিহ্নিত করেননি, তাঁরা নিজেদের দোষও স্বীকার করেছেন। আদালত বলেছেন, ‘অতীতে সুপ্রিম কোর্ট ভুল করে সামরিক শাসনকে বৈধতা দিয়েছেন।’ এই প্রথম বাংলাদেশে উচ্চ আদালত অতীত কাজের সমালোচনা করলেন। এ জন্য আদালতকে অভিনন্দন জানাই।
নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের মধ্যে আইনি লড়াই চলে আসছে সেই পাকিস্তানি আমল থেকে। ১৯৫৫ সালে গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ যখন পাকিস্তান গণপরিষদ ভেঙে দিলেন, তখন তাঁর বিরুদ্ধে স্পিকার তমিজউদ্দিন খান মামলা করেছিলেন। লাহোর হাইকোর্ট এই পদক্ষেপকে বেআইনি ঘোষণা করলেও সুপ্রিম কোর্ট বৈধতা দিয়েছিলেন। এভাবে আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খান, জিয়াউল হক ও পারভেজ মোশাররফের সামরিক শাসনও বৈধতা পেয়ে যায়।
বাংলাদেশে ১৯৭৫ সালের পনেরোই আগস্ট, যেদিন দেশের নির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করে কিংবা ১৯৮২ সালে যখন নির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে সরিয়ে উচ্চাভিলাষী সেনানায়ক ক্ষমতা কুক্ষিগত করেন, তখন যদি উচ্চ আদালত তাঁর বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিতেন, তাহলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস হয়তো ভিন্ন হতো। বারবার সামরিক শাসনের জগদ্দল পাথর দেশবাসীর ওপর চেপে বসতে পারত না। পাকিস্তানের কাছ থেকে আমরা সামরিক শাসনসহ অনেক অপকীর্তি উত্তরাধিকারসূত্রে বয়ে বেড়াচ্ছি। পাকিস্তানের প্রথম সেনাশাসক আইয়ুব খান থেকে শুরু করে সব সেনাশাসকই নিজেদের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করতে গণভোটের আশ্রয় নিয়েছিলেন। আপিল বিভাগের রায়ে গণভোটকে বাতিল করা হয়েছে। ফলে তথাকথিত গণভোটের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত শাসনও বাতিল হয়ে গেল। অতীতে সামরিক শাসনকে বৈধতা দিতে রাজনীতিকেরা এক পায়ে খাড়া ছিলেন, বিচারকেরাও পিছিয়ে ছিলেন না। জিয়ার রাজনীতির প্রধান পরামর্শক ছিলেন বিচারপতি সাত্তার। বিচারপতি সায়েমের দায়িত্ব গ্রহণকে পরিস্থিতির প্রয়োজন হিসেবে দেখা গেলেও বিচারপতি আহসান উদ্দিন আহমেদের বিষয়টি কীভাবে নেওয়া হবে? তাঁকে তো ধরে-বেঁধে কেউ রাষ্ট্রপতি করেননি। সামরিক শাসকেরা প্রয়োজনে সিভিলিয়ানদের রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দেন, আবার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে তাদের ছুড়ে ফেলে দিতেও দ্বিধা করেন না। জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিচারপতি সায়েমের বিরোধ কিংবা এরশাদের শাসনামলে আতাউর রহমান খানের প্রধানমন্ত্রিত্ব গ্রহণ ও বিদায়ের পেছনেও এই কূটকৌশল কাজ করেছে।
সম্প্রতি পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদও এক আইনে জিয়াউল হকের সামরিক শাসন তথা অষ্টম সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশের সংবিধানে কালো ক্ষতের মতো লেপ্টে থাকা অষ্টম সংশোধনী কবে বাতিল হবে, সেটাই প্রশ্ন। রাজনীতিকেরা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকে যতটা পশ্চাৎপদ ভাবছেন, আসলে তারা ততটা পশ্চাৎপদ নয়। এত দিন রাজনীতিকেরা সংবিধানের সংশোধনী নিয়ে কথা বলতে ভয় পেতেন, শব্দচয়নে অতি সতর্ক ছিলেন, এমনকি ধর্মনিরপেক্ষতা শব্দটিও মুখে আনতেন না। বলতেন অসাম্প্রদায়িকতা। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের রায়ে পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করে যখন ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিস্থাপন করা হলো, তখন জনগণের মধ্যে কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যায়নি। বাংলাদেশের মানুষ যে রাজনীতিকদের চেয়ে অগ্রগামী, তা আবারও প্রমাণিত হলো।
আগের জরুরি কথাটি সবার শেষে বলতে চাই। আদালত তাঁর ঐতিহাসিক রায়ে নিজেদের ভুল স্বীকার করেছেন। প্রশ্ন হলো, রাজনীতিকেরা কবে তাঁদের ভুলটি স্বীকার করবেন? রাজনীতিকদের ভুলের কারণেই সাংবিধানিক শাসন ব্যাহত হয়। ভুল স্বীকার না করলে ভুল শুধরানোরও প্রশ্ন আসে না। ব্যক্তি ভুল করলে তার জন্য হয়তো একজনকেই কাফফারা দিতে হয়। কিন্তু রাজনীতিকেরা ভুল করলে তার জন্য কাফফারা দিতে হয় সমগ্র জাতিকে। আদালত অতীতের ভুলের জন্য রাজনীতিকদের ভর্ৎসনা করেছেন, আশা করি রাজনীতিকেরা এমন কোনো ভুল করবেন না, যাতে ভবিষ্যতেও তাঁদের একইভাবে ভর্ৎসনা শুনতে হয়।
সোহরাব হাসান: সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net

July 31, 2010 Posted by | Uncategorized | , , | Leave a Comment

১৯৭২-এর মূল সংবিধানে ফিরে যাওয়া কেন প্রয়োজন?

বাংলাদেশের মানুষের যথেষ্ট নৈতিক ও রাজনৈতিক কারণ রয়েছে ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে ফিরে যাওয়ার জন্য। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিয়েছে এবং জাতিকে আশ্বাস দিয়েছে যে রাষ্ট্র কীভাবে আবার মূল সংবিধান দ্বারা পরিচালিত হতে পারে এবং সে ব্যাপারে কাজ চলছে। এতে আমরা সবাই আশান্বিত হয়েছি এবং আমাদের ভাবার সময় এসেছে যে যেসব কারণ এবং যুক্তির ওপর ভিত্তির ওপর নির্ভর করে আমরা ১৯৭২ সালের সংবিধানে ফিরে যাচ্ছি, সেসব কারণ ও যুক্তি জনগণের সামনে তুলে ধরা হবে। মোট কথা, ক্ষমতাসীন দল এবং আপামর সিভিল সমাজের ওপর আজ এই দায়িত্ব বর্তায় যে তারা যেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এবং বিভিন্ন ফোরামের মাধ্যমে ১৯৭২ সালের সংবিধানের কথা দেশের মানুষের সামনে তুলে ধরে। এই কাজটি অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে এ কারণে যে ১৯৭২-এর বিরোধীরা ইতিমধ্যে তাদের সেই পুরোনো খেলায় মেতে উঠেছে। দেশে ইসলামের অবস্থান কী হবে, সংবিধানে বিসমিল্লাহ থাকবে কি থাকবে না ইত্যাদি বিষয়ে এই শ্রেণীর দল ও ব্যক্তি যে বড় ক্ষতি সাধন করতে পারে এবং আমাদের আবার অন্ধকারে ঠেলে দিতে পারে, সেই বিষয়ে বোধকরি আমাদের কারোর কোনো সন্দেহ নেই।
আমরা কেন ১৯৭২-এর সংবিধানে ফিরে যেতে চাই? এই প্রশ্নের উত্তর একটিই এবং অতি সহজ। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে যে লক্ষ্য নিয়ে আমরা সবাই সংগ্রাম করেছি পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে, সেই লক্ষ্য বাস্তবায়িত করতে হলে ১৯৭২ সালের সংবিধানে ফিরে যাওয়ার কোনো বিকল্প নেই। জাতির জন্য এটা অত্যন্ত পীড়াদায়ক ব্যাপার যে সেই ১৯৭০-এর দশকের গোড়াতেই আমরা ১৯৭২-এর সংবিধানের মূল চেতনার ওপর আঘাত এনেছিলাম। সংবিধানের লক্ষ্য ছিল দেশে পুরোপুরিভাবে একটি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করা এবং সেই লক্ষ্য অর্জনের উদ্দেশ্যে স্বাধীনতা-পরবর্তীকালের প্রথম সাড়ে তিন বছর অতিবাহিত হয়। হ্যাঁ, দেশ তখন যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি স্থানে পরিণত হয়েছিল। যুদ্ধের মধ্য দিয়ে একটি জাতি স্বাধীন হলে যে পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়, সেই ধরনের অভিজ্ঞতা আমাদের বাঙালিদের জীবনে আমরা অর্জন করেছি। কিন্তু আমাদের আনন্দের এবং আশার বিষয় ছিল যে আমরা এসব সমস্যা থাকা সত্ত্বেও দেশে একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অগ্রসর হচ্ছিলাম ১৯৭২-এর সংবিধানের দ্বারা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর সঙ্গে যাঁরা এই সংবিধান রচনা করেন এবং বাংলাদেশের নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিরা যে এই সংবিধান আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করেন, তাতে করে আমাদের রাজনীতি পূর্ণতা লাভ করেছিল। আজ এতগুলো বছর পার হয়ে যাওয়ার পর আমাদের সবার মনে কেবল একটাই প্রশ্ন—আমরা কোথায় ভুল করেছিলাম? ভুল যে আমরা করেছিলাম সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ভুল না করলে কি আজ যে নতুন সংগ্রামে আমরা জাতিগতভাবে লিপ্ত, সেই সংগ্রামের প্রয়োজন হতো? এবং সর্বপ্রথম যে ভুলটা আমরা করেছি সেটা ছিল সংবিধানে ১৯৭৫ সালের গোড়াতে চতুর্থ সংশোধনী নিয়ে আসা। আমরা যতভাবেই আজ ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করি না কেন, তখনকার পরিস্থিতিতে ওই পদক্ষেপের খুবই প্রয়োজন ছিল কি? এই সত্য কোনোভাবেই অস্বীকার করার উপায় নেই যে ওই চতুর্থ সংশোধনী ১৯৭২-এর সংবিধানের ওপর একটি অতর্কিত আঘাত ছিল এবং সেই আঘাতের সদ্ব্যবহার করেছেন ওই সব সামরিক ও বেসামরিক শাসক, যাঁরা বাংলাদেশকে একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত করতে চেয়েছেন সেই ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট থেকে। জানুয়ারি ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু চতুর্থ সংশোধনীর দিকে অগ্রসর না হলে আমাদের সবারই মঙ্গল হতো।
সংবিধানের পরবর্তী ইতিহাস আমাদের সবারই জানা আছে। সেই ইতিহাস আবার তুলে ধরার খুব একটা প্রয়োজন নেই। তবে আমাদের এই সত্যটি মনে রাখতে হবে যে যদিও চতুর্থ সংশোধনী একটি ভুল পদক্ষেপ ছিল, তার পর যে আক্রমণগুলো সংবিধানের ওপর করা হয়েছে সেগুলো ছিল আমাদের মূল চেতনার ওপর সরাসরি আঘাত। আজ জেনারেল জিয়াউর রহমানের পক্ষের লোকেরা তাঁর সমর্থনে অনেক কথাই বলে থাকেন, যে কথার কোনো অর্থ হয় না। এবং হয় না এ কারণে যে সামরিক শাসকের ভূমিকা পালন করতে গিয়ে তিনিই সর্বপ্রথম মূল সংবিধানের চেতনার ওপর আঘাত করেন। এই কাজটি তাঁর এখতিয়ারের বাইরে ছিল। তিনি যেভাবে সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদকে কলমের খোঁচায় মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিলেন, তা ছিল গর্হিত অপরাধ এবং রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল। আমাদের বাংলাদেশের সমাজ যদি সভ্য সমাজ হতো, সচেতন সমাজ হতো, তাহলে এই সংবিধানবিরোধী কাজের জন্য জিয়া এবং ওই সব রাজনীতিবিদ যাঁরা তাঁর এই কার্যকলাপগুলো সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করেছেন, সবাইকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাত। আমাদের সবাইকে লজ্জিত হতে হয় যখন শুনি যে এখনো একশ্রেণীর রাজনীতিক দেশে আছেন, যাঁরা পঞ্চম সংশোধনীর পক্ষে কথা বলেন। যেখানে তাঁদের অনুতপ্ত হওয়ার কথা সেই সংশোধনী সমর্থন করার জন্য সেখানে তাঁরা সেই অগণতান্ত্রিক কাজটির পক্ষে এখনো বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন।
সংবিধানবিরোধী কাজ শুধু জিয়াই করেননি। আমাদের ভুলতে অসুবিধা হয় যে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ কত সহজভাবে গোটা জাতির ওপর ইসলাম ধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম বলে চাপিয়ে দিলেন। যে দেশের মানুষ বেশির ভাগই মুসলমান এবং যুগ যুগ ধরে ইসলামী বিধান পালন করে এসেছে, সেই মানুষকে এরশাদ তাঁর সংকীর্ণ স্বার্থে বলার চেষ্টা করলেন রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলাম থাকলে তাঁরা আরও ভালো মুসলমান হবেন। এর ফলে যা হয়েছে তা ১৯৭১ সালে আমাদের কাম্য ছিল না। যদি আপনি একযোগে জিয়া, এরশাদ ও বাংলাদেশ জাতীয়দাবাদী দলের রাজনীতির পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখেন, তাহলে আপনার বুঝতে কোনো অসুবিধা হবে না যে এই সব কিছুর মূলে ছিল বাংলাদেশকে এমন একটি রাষ্ট্রে পরিণত করা, যে রাষ্ট্রে কেবল মুসলমান সম্প্রদায়ই প্রাধান্য লাভ করবে। ওই যে তথাকথিত বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের বিষয়টি রয়েছে, সেটি ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে সেই ১৯৪০-এর মুসলিম লীগ প্রবর্তিত দ্বিজাতির তত্ত্বের কথাই আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়। যে ১৯৭২-এর সংবিধানে আমরা যথার্থ কারণেই বাঙালি জাতীয়তাবাদকে তুলে ধরেছিলাম, সেই সত্যের বিরুদ্ধে একটি বড় মিথ্যা আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। আমাদের দুঃখ একটাই—আমরা বাঙালি ১৯৭১-এ পাকিস্তান এবং দ্বিজাতিতত্ত্বের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে জয়ী হয়েছি। কিন্তু এত বিশাল একটি বিজয় আমাদের হাতছাড়া হলো এবং এই বাংলাদেশটাকে একটি ছোট পাকিস্তানে পরিণত করা হলো। জিয়া-এরশাদ-বেগম জিয়া অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ স্লোগান দিয়ে থাকেন। তাঁদের অথবা তাঁদের সমর্থকদের কি একবারও মনে থাকে না সেই ‘জয়বাংলা’র কথা? দেশটা যে সব বাঙালির জন্য এবং এই দেশে যে সব সম্প্রদায়ের মানুষ, সব গোত্রের মানুষ বসবাস করে—এই কথা তাঁদের মেনে নিতে এত কষ্ট কেন হয়?
১৯৭২-এর সংবিধানে ফিরে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের ইতিহাসকে পুনরায় ফিরে পাওয়া। কেবল ১৯৭২-এর মূল সংবিধানের মধ্য দিয়েই আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে পুনর্জাগ্রত করতে পারব, আমাদের মনের মধ্যে আমাদের প্রাণের গভীরে। এই মুহূর্তে আমাদের প্রয়োজন সম্মিলিতভাবে আমাদের শেকড়ে ফিরে যাওয়া এবং সেটা সম্ভব ওই ১৯৭২-এর সংবিধানকে পুনর্বহালের মধ্য দিয়েই। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখানে উল্লেখ করা দরকার। ১৯৭২-এর সংবিধানে এই দেশে যেসব অবাঙালি জাতি ও গোত্র বসবাস করে—যেমন চাকমা, ম্রো, মারমা, সাঁওতাল ইত্যাদি; তাদের কোনো সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। সেই ভুলটি সংশোধন করা আমাদের সবার দায়িত্ব—আদিবাসী জনগণ তাদের সংস্কৃতি, তাদের ভাষা, তাদের ঐতিহ্য তাদের নিজ আবাসভূমিতে সাংবিধানিকভাবে বজায় রাখবে, তুলে ধরবে—এই বিষয়টি সংবিধানে নিশ্চিত করা খুবই প্রয়োজন। আমাদের স্মরণ রাখতে হবে, আমরা যেন বাঙালির চেতনা, বাঙালি জাতীয়তাবাদের কথা বলতে গিয়ে আদিবাসী জনগণকে আবার অবহেলা না করি, আবার ভুলে না যাই।
ইতিহাসকে সমুন্নত রাখতে হবে। ১৯৭২-এর মূল সংবিধান সেই ইতিহাসের কথাই বলে।

সুত্র ঃ প্রথম আলো, ২৪-০৭-২০১০
সৈয়দ বদরুল আহ্সান: সাংবাদিক।

July 25, 2010 Posted by | Uncategorized | Leave a Comment

Shakira : Waka Waka Lyrics (World Cup Kickoff Concert)

Oooeeeeeeeeeeeeeeeehh

You’re a good soldier
Choosing your battles
Pick yourself up
And dust yourself off
Get back in the saddle

You’re on the front line
Everyone’s watching
You know it’s serious
We are getting closer
This isn’t over

The pressure is on
You feel it
But you got it all
Believe it

When you fall get up, oh oh
If you fall get up, eh eh
Tsamina mina zangalewa
Cuz this is Africa
Tsamina mina, eh eh
Waka waka, eh eh
Tsamina mina zangalewa
This time for Africa

Listen to your God
This is our motto
Your time to shine
Don’t wait in line
Y vamos por todo

People are raising
Their expectations
Go on and feed them
This is your moment
No hesitations

Today’s your day
I feel it
You paved the way
Beleive it

If you get down get up, oh oh
When you get down get up, eh eh
Tsamina mina zangalewa
This time for Africa
Tsamina mina, eh eh
Waka waka, eh eh
Tsamina mina zangalewa
Anawa a a
Tsamina mina, eh eh
Waka waka, eh eh
Tsamina mina zangalewa
This time for Africa

(Lady Singing)

Voice: Tsamina mina, Anawa a a
Tsamina mina
Tsamina mina, Anawa a a

Tsamina mina, eh eh
Waka waka, eh eh
Tsamina mina zangalewa
Anawa a a
Tsamina mina, eh eh
Waka waka, eh eh
Tsamina mina zangalewa
This time for Africa

Django eh eh
Django eh eh
Tsamina mina zangalewa
Anawa a a

Django eh eh
Django eh eh
Tsamina mina zangalewa
Anawa a a

(2x) This time for Africa

(2x) We’re all Africa

June 13, 2010 Posted by | Uncategorized | Leave a Comment

Lyrics of the World Cup 2010 Theme Song

Piala Dunia (Official Theme Song World Cup 2010) Knaan Wavin Flag Lyrics

Ooooooh Wooooooh

Give me freedom, give me fire, give me reason, take me higher
See the champions, take the field now, you define us, make us feel proud
In the streets are, exaliftin , as we lose our inhabition,
Celebration its around us, every nation, all around us

Singin forever young, singin songs underneath that sun
Lets rejoice in the beautiful game.
And together at the end of the day.

WE ALL SAY

When I get older I will be stronger
They’ll call me freedom Just like a wavin’ flag
And then it goes back
And then it goes back
And then it goes back

When I get older I will be stronger
They’ll call me freedom
Just like a wavin’ flag
And then it goes back
And then it goes back
And then it goes

Oooooooooooooh woooooooooohh hohoho

Give you freedom, give you fire, give you reason, take you higher
See the champions, take the field now, you define us, make us feel proud
In the streets are, exaliftin, every loser in ambition,
Celebration, its around us, every nations, all around us

Singin forever young, singin songs underneath that sun
Lets rejoice in the beautiful game.
And together at the end of the day.

WE ALL SAY

When I get older, I will be stronger
They’ll call me freedom
Just like a wavin’ flag
And then it goes back
And then it goes back
And then it goes back

When I get older I will be stronger
They’ll call me freedom
Just like a wavin’ flag
And then it goes back
And then it goes back
And then it goes

Wooooooooo Ohohohoooooooo ! OOOoooooh Wooooooooo

WE ALL SAY !

When I get older I will be stronger
They’ll call me freedom
Just like a wavin’ flag
And then it goes back
And then it goes back
And then it goes back

When I get older I will be stronger
They’ll call me freedom
Just like a wavin’ flag
And then it goes back
And then it goes back
And then it goes

Wooo hooooo hohohohoooooo
And everybody will be singinit
Wooooooooo ohohohooooo
And we are all singinit

June 12, 2010 Posted by | Uncategorized | Leave a Comment

ব্র্যাকের কর্ণধার ফজলে হাসান আবেদ : চিন্তা এবং চেতনায়

ব্র্যাকের কর্ণধার ফজলে হাসান আবেদ। সম্প্রতি পেয়েছেন নাইট উপাধি। পুরস্কার বা সম্মান নতুন কিছু নয়, তাঁর জন্য। ব্র্যাকের কাজ শুরু করার আট বছরের মাথায় ১৯৮০ সালে তিনি পেয়েছিলেন র্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার। ১৯৭০-এর ঘূর্ণিঝড়ের পর থেকে ত্রাণ ও পুনর্বাসনের কাজের সঙ্গে যুক্ত এই মানুষটিকে জানতে চাই আমরা। দেখি, ভেতরে বাস করে এক কবি মানুষ।

‘কবি হতে চেয়েছিলাম, কিন্তু সবাই তো আর কবি হতে পারে না, তবে কবিতার প্রতি টান আমার এখনো আছে। রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ দাশ থেকে শুরু করে একেবারে তরুণ কবির কবিতাও আমি পড়ি। এখন সবচেয়ে বেশি পড়ি অবশ্য শেকসপিয়র। চার্লস ডারউইন বলেছিলেন—বিবর্তনবাদ নিয়ে ৩০ বছরের কাজের সাধনার কারণে সবচেয়ে বড় যে ক্ষতিটা তাঁর হয়েছে, তা হলো শেকসপিয়র পড়ে তিনি আর আগের মতো আপ্লুত হন না। আমি সারাক্ষণই শেকসপিয়র আওড়াই। শেকসপিয়রের হাজার হাজার লাইন আমি এখনো মুখস্থ বলতে পারি।’…কথাগুলো বলছিলেন ফজলে হাসান আবেদ।
বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের কর্ণধার এই মানুষটির জন্য পুরস্কার বা সম্মানপ্রাপ্তি নতুন কিছূ নয়। সম্প্রতি তিনি নিজের জন্য, প্রতিষ্ঠানের জন্য, দেশের জন্য যে সম্মানটি বয়ে এনেছেন তা হলো ‘নাইট’ উপাধি। বিনয়ের সঙ্গে বলছিলেন, ‘আমি কখনই মনে করি না, পুরস্কার বা সম্মান আমার একার অর্জন। কোনো পুরস্কার পেলে আমি সবচেয়ে বেশি গর্ববোধ করি ব্র্যাকের কর্মীদের জন্য। কারণ পুরস্কার পাওয়ার আনন্দে তারা খুবই উত্ফুল্ল হয় এবং তাদের কাজের গতি বেড়ে যায়।’ ১৯৮০ সালে র্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার ছিল ফজলে হাসান আবেদের পাওয়া প্রথম আন্তর্জাতিক পুরস্কার। ব্র্যাকের কাজ শুরু হওয়ার মাত্র আট বছরের মাথায় এই পুরস্কার পান তিনি।
১৯৭০-এর ১২ নভেম্বরের সেই ঘূর্ণিঝড় ফজলে হাসান আবেদের মনেও ঝড় তোলে। চারদিকে লাশ, হাজার হাজার মানুষ অসহায়, অনিশ্চিত জীবনযাত্রা, ভঙ্গুর জীবন…গড়ে তুললেন একটি প্রতিষ্ঠান ‘হেল্প’। তখন তিনি শেলওয়েল কোম্পানিতে চাকরি করেন। ভাবলেন, একপর্যায়ে ‘হেল্প’-এ এসে পুরোপুরি যোগ দেবেন। এরই মধ্যে ১৯৭১। সে সময় গভর্নর ছিলেন টিক্কা খান। এপ্রিল মাসে ফজলে হাসান আবেদকে বলা হলো, সারা দেশে গ্যাস বিতরণ এবং তেলবাহী জাহাজ ভেড়া নিশ্চিত করা, এসব কাজের জন্য গভর্নর অফিসে সমন্বয়কের (লিয়াজোঁ অফিসার) দায়িত্ব পালন করতে। কিন্তু তাঁর মনে হলো, ‘আমি এই মিলিটারির চাকরি করব নাকি!’ দুই-একদিন পরই তাঁকে দেওয়া হলো বাঘ মার্কা একটি সরকারি পরিচয়পত্র। এই পরিচয়পত্রটি নিয়ে তিনি পাকিস্তান চলে গেলেন। পরবর্তী সময়ে আফগানিস্তান হয়ে লন্ডন। লন্ডনে গিয়ে ‘অ্যাকশন বাংলাদেশ’-এর কাজ শুরু করলেন। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত তৈরি করা, প্রচারণাপত্র বিলি করা, পথনাটক, টাইমস অব লন্ডনে লেখা, বিজ্ঞাপন প্রকাশ থেকে শুরু করে তহবিল সংগ্রহ। অতঃপর যুদ্ধ শেষ। স্বাধীন বাংলাদেশে ফেরা। রাস্তাঘাট, সেতু নেই। একা সরকারের পক্ষে সব জায়গায় পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা, সব সমস্যার সমাধানও সম্ভব নয়। তখন সীমিত উদ্যোগেই একটি অঞ্চলে কাজ শুরু করা হলো। বেছে নেওয়া হলো সুনামগঞ্জের হিন্দু-অধ্যুষিত শাল্লা থানা। এখানে পাকিস্তানি বাহিনীর অত্যাচারের মাত্রা ছিল বেশি। অঞ্চলের বাসিন্দারা যুদ্ধের সময় ভারতে চলে গিয়েছিল। ফিরে এসে দেখে, ঘরবাড়ি নেই, গরু নেই, বীজ নেই। গ্রামকে গ্রাম উজাড়। এত দুর্গম এলাকা যে ঢাকা থেকে কোনো সাহায্যও পৌঁছবে না সেখানে। জেলেরাই এ অঞ্চলে প্রধানত বেশি থাকে। অতঃপর ওখানেই কাজ শুরু করলেন ফজলে হাসান আবেদ।
বলছিলেন, ‘ওখানে ২০-২৫ জন যুবক, যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে বা পাস করেছে, তাদের নিয়ে জরিপ করলাম, কত ঘরবাড়ি নাই? কয়টা গরু নাই? ওখানে একটাই ফসল হয়, বোরো ফসল। ওই সময়ের মধ্যে যদি ওরা ফসল ফলাতে না পারে, তাহলে অনাহারে থাকবে। আমরা দেখলাম, ওদের গরু নেই। এত গরু এনে যে চাষ করব, তার সময়ও ছিল না। তাই যেখানে যেখানে পাওয়ার টিলার পাওয়া যায়, তা এনে কর্ষণ করা হলো জমি। বোরো ধান যাতে হতে পারে। বোরো ধান যদি মার্চের দিকে না লাগানো হয়, তাহলে আর হয় না। আশপাশের গ্রাম থেকে জলি ধানের বীজ সংগ্রহ করে ওদের সরবরাহ করা হলো, যেন প্রথম একটা ফসল আসে। তারপর মাছ ধরার নাইলন জাল নিয়ে এলাম জাপান থেকে, নৌকা বানানোর কাঠ নিয়ে এলাম আসাম থেকে, কুশিয়ারা নদী দিয়ে ভাসিয়ে। বাঁশ আনা হলো ২২ লাখ, যেন ঘর বানানো যায়। সিআই শিট নিয়ে এলাম জাপান থেকে, ১২০০ টন। এগুলো নিয়ে এসে ১৮০০০ ঘর বানানো হয়েছিল। ঘর দেওয়ার ব্যাপারেও একটু সমস্যা হয়েছিল। কোনো কোনো পরিবারে চারজন মানুষ, তিনটা ঘর আছে। কোনো পরিবারে চারজন মানুষ, একটা ঘর। আমরা বললাম, কোনো পরিবারের তিনটা ঘর থাকলেও আমরা দেব একটা ঘর। তিনজনের ওপর সদস্য হলে বড় ঘর, নিচে হলে ছোট ঘর। বড়লোকের জন্য বেশি ঘর দেব, গরিব লোকের জন্য ছোট ঘর দেব, সেটা নয়। একই রকমের ঘর সবার জন্য। এরপর কারও সঙ্গতি হলে সে নিজেই বাকিটা করে নেবে।
প্রথমে আমার বাড়ি বিক্রির টাকা দিয়ে কাজ আরম্ভ করেছিলাম। কিন্তু মাস দুয়েকের মধ্যে লন্ডনের অক্সফাম থেকে লোক এল। জানতে চাইল, আমরা কী করতে চাই? আমরা আমাদের জরিপের ভিত্তিতে প্রকল্পটা দিই। মাসখানেক পর ওরা চিঠি লিখল, আপনাদের এই প্রকল্পে আমরা দুই লাখ পাউন্ড দেব। যখন সে টাকা পেয়ে গেলাম, তখন তো আর সমস্যা থাকল না। চলল প্রায় ১০ মাস।
ইচ্ছে ছিল বছর দুয়েক এখানে থাকব, তারপর আমেরিকা বা ইংল্যান্ডে চলে যাব। কিন্তু এক বছর পর যখন ত্রাণের কাজ শেষ হয়েছে, তখন মনে হলো, যে লোকগুলোকে আমরা সাহায্য করেছি, তাদের এভাবে ফেলে যাওয়া ঠিক হবে না। দারিদ্র্য বিমোচন হবে না। সত্যিকারের দারিদ্র বিমোচন এক বা দুই বছরের কাজ নয়। জীবনের জন্যই এটা একটা দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ব (কমিটমেন্ট) না নিলে এটা করা যাবে না। আমাদের লোকজনকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমরা বহু দিন এই কাজ নিয়ে থাকবে? কেউ কেউ বলল, না পারব না। বললাম, যারা থাকতে না চাও, তারা অন্য চাকরি খোঁজো। তবে অনেকেই থেকে গেল।
দরিদ্র মানুষের উন্নয়ন নিয়ে কয়েকটি উপলব্ধির কথা বলি। একসময় মনে হলো, ত্রাণে উন্নয়ন হবে না, নিজের উন্নয়ন নিজে করতে হবে, সেই পরিবেশ সৃষ্টি করে দেওয়া যাবে, কিছু সুযোগ-সুবিধা তৈরি করে দিতে হবে। ঋণ দিতে হবে। তা খাটিয়ে সে যদি তার নিজের উন্নয়ন করতে পারে, তাকে যদি শিক্ষা দিতে পারি, তাহলে কিছু একটা হয়। অনেকগুলো নৈশবিদ্যালয় চালু করলাম আমরা। কিন্তু দেখলাম, খুব বেশি সাফল্য লাভ করিনি। কারণ, গরিব মানুষ সারা দিন খেটে এসে লণ্ঠনের আলোয় পড়তে চায় না। দুই-একদিন আসে, অক্ষর শিখে গেলে মনে করে আর শেখার দরকার নেই। লেখাপড়া গৌণ, রোজগার মুখ্য। তখন আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম অক্ষরজ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ নয়। নিরক্ষরকে অক্ষরদান করলে তার ক্ষমতায়ন হবে, তা নয়, ক্ষমতায়ন করতে হলে তার সচেতনতা বাড়াতে হবে। সচেতনতা বাড়াতে গিয়ে আমরা নতুন কিছু কৌশল বের করলাম। যেমন একটা শব্দ, উপোস—উ পো স। উপোস নিয়ে আলাপ হয়। উপোস কেন করে লোকে? খাবার নেই। খাবার নেই কেন? জমি নেই। জমি নেই কেন, ওর কেন আছে। এ নিয়ে তো অনেকরকম বিশ্লেষণ করা যায়, তা থেকে একটা উত্তর বেরিয়ে আসে। এসব আলাপের মাধ্যমে আমাদের জীবনযাত্রা, সমাজ কাঠামো নিয়ে আসা যায়।
আশির দশকের পুরোটাই গেছে নারীদের কাউন্সেলিং নিয়ে। ব্র্যাকের পরিচয় প্রথম হলো ডায়েরিয়ার জন্য খাবারের স্যালাইন নিয়ে। সারা দেশেই পরিচিত হয়েছিল। আমরা এক কোটি ৩০ লাখ পরিবারের কাছে গিয়েছি, হাতে-কলমে মাকে শিখিয়েছি। সেটা করতে ১০ বছর লেগেছে। নব্বইয়ের দশকে যখন এই কর্মসূচি শেষ হয়, চিন্তা করলাম, যেই সংগঠন বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি বাড়িতে যেতে পারে, সেই সংগঠন তো যেকোনো কর্মসূচি বাংলাদেশের সর্বত্র নিয়ে যেতে পারে। তখন আমরা আমাদের দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি সম্প্রসারণ করতে শুরু করি সারা বাংলাদেশে।
নারীদের কেন্দ্র করে কর্মসূচি গড়ে তুললেন কেন?
শুরুতে আমাদের কেন্দ্র ছিল পুরুষ-নারী উভয়েই। কিন্তু নারীকে কেন্দ্রে আনার প্রধান কারণ হলো, আমি গ্রামে-গঞ্জে যেতাম প্রায়ই। একটা মেয়ে শিশু, তিন বছর বয়স। সে তার ছয় মাস বয়সী ভাইকে কোলে নিয়ে বসে আছে। তার পাঁচ বছর বয়সী বড় ভাই ঠিকই খেলে বেড়াচ্ছে, কিন্তু মেয়েটা অতি ছোটবেলা থেকেই কিন্তু মানুষ ও বাড়ি সম্পর্কে ব্যবস্থাপনা শিখে ফেলে। ম্যানেজমেন্ট অব পোভার্টি কেন মেয়েরা করে? যে পুরুষ দৈনিক ভিত্তিতে কাজ করে, সে এক দিন কাজ না পেলে টাকা আনে না। সেদিন তো খাওয়া নেই। সে চায়ের দোকানে বা রিকশাওয়ালার সঙ্গে আড্ডা দেয়। বাড়িতে আর আসে না। কিন্তু ঘরে যে তিন-চারটি শিশু আছে, তাদের তো খাওয়াতে হবে মায়ের, নইলে তো ওরা কাঁদবে। আধা সের চাল ধার করবে অথবা কোনো না কোনোভাবে ব্যবস্থা করবে। আমরা কাজের মাধ্যমে আরও জেনেছি, নারীরা সুশৃঙ্খল ও সঞ্চয়ী। তাই দারিদ্র্যব্যবস্থাপনা করছে নারীই। অর্থাত্ যদি দারিদ্র্যের আঘাতটা নারীর ওপরই আসে, তাহলে দারিদ্র্য বিমোচন উন্নয়নের কাজটিও করতে হবে নারীদেরই।
বলা হয়, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সংগঠন ব্র্যাক, এটা আমরা কোনো বিচারে দেখব? সংখ্যাগতভাবে নাকি গুণগত দিক দিয়ে?
প্রথমেই বলি, লোকে জানতে চায়, কতসংখ্যক লোক আপনার সংগঠনে চাকরি করছে। সেদিক থেকে আমরা সবার ওপরে। এক লাখ ২০ হাজারের মতো আমাদের চাকরিজীবী। এটা গেল একটা। আরেকটা পরিসংখ্যান হলো, কতটা ইফেক্টিভ বা কার্যকর। এখন সবাই স্বীকার করে, আমরা সবচেয়ে কার্যকর সংগঠন। বাংলাদেশ নিয়ে পৃথিবীর নয়টি দেশে ব্র্যাক এখন কাজ করছে।
মানুষের জীবনের তো স্বপ্নের একটা পরিধিও থাকে। কতদূর যাব, স্বপ্নটা কতদূর দেখব। এখন ব্র্যাককে যে জায়গায় নিয়ে গেছেন, স্বপ্নটা কি এতদূরই দেখেছিলেন?
বাংলাদেশের বাইরে গিয়ে কাজ করব, সেটা কিন্তু আমি কোনোদিন চিন্তা করিনি। সারা বাংলাদেশে কাজ করব, এটাই ছিল আমার লক্ষ্য। কিন্তু একসময় মনে হলো, বেসরকারি সংগঠন হিসেবে যদি আমি সারা বাংলাদেশে কাজ করতে পারি এবং একটা নতুন মডেল তৈরি করতে পারি, তাহলে আমি সরকারি চাকুরে বা রাজনীতিবিদদের চেয়েও ভালোভাবে বাংলাদেশের সেবা করতে পারব। একজন আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, আপনি রাজনীতিতে না গিয়ে এটা করলেন কেন? বললাম, দেখেন, আমি যদি ভারতবর্ষের লোক হতাম, তাহলে রাজনীতিতে যেতাম। কারণ, ভারতের মতো বড় দেশে কাজ করা বেসরকারিভাবে সম্ভব নয়। কিন্তু বাংলাদেশে সেটা সম্ভব। দেশ পরিবর্তনের জন্য সাধারণত রাজনীতিবিদ ও সোশ্যাল এন্টারপ্রেনাররা চিন্তা করেন। একটি ঐতিহাসিক সময় আমাদের যৌবন কেটেছে। আমরা ভেবেছি, যদি ২০ বছর সময় পাই, তাহলে আমরা বাংলাদেশে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারব।
সাহায্য ও পুনর্বাসন নিয়ে যখন কাজ করছিলাম, তখন কেউ কেউ আমাকে প্রশ্ন করছিল, এ কাজের জন্য এত এমএ পাস লোক নিচ্ছেন কেন? এ কাজ তো এসএসসি পাস লোকই করতে পারে। আমি বলেছি, না, আমি চাচ্ছি এমএ পাস লোকগুলো গ্রামে-গঞ্জে ত্রাণ দিয়ে গ্রাম সম্পর্কে একটা ধারণা পাক। এরা তো পরে আমার ম্যানেজার হবে। মাঠপর্যায় থেকে আস্তে আস্তে ওপরে নিয়ে আসব। ইচ্ছা ছিল, এমএ পাস ছেলেদের দিয়ে যদি একটা ক্যাডার তৈরি করতে পারি, যারা গ্রামের দরিদ্র লোকদের চেনে, তাহলে আমার সংগঠনটি আস্তে আস্তে বড় হতে পারবে।
ব্র্যাকের ইতিহাস লিখতে গেলে এত অল্প পরিসরে হয়তো হবে না। তা ছাড়া ব্যাকের নিজস্ব প্রকাশনা অনেক ব্যাপক। তা থেকে আমরা জেনে নিতে পারি অনেক কিছুই। তার চেয়ে চলুন, মানুষ ফজলে হাসান আবেদের সঙ্গে কথা বলি আরও কিছুক্ষণ—
দেয়ালে বাংলাদেশের শিল্পীদের চিত্রকর্ম। তাকে তাকে রাখা সম্মান আর পুরস্কার অর্জনের সাক্ষর। ব্র্যাক সেন্টারে নিজের সভাকক্ষে বসে কাচের জানালা দিয়ে দূরে নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে জীবনের আদর্শ হিসেবে দুটো মানুষের কথা বললেন হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচংয়ে জন্ম নেওয়া মানুষটি। যাঁর পূর্বপুরুষ ছিলেন সেই অঞ্চলের জমিদার। বললেন, মা সৈয়দা সুফিয়া খাতুন আর ছোট চাচা শহীদ সায়ীদুল হাসানের কথা।
‘আমার মা ছিলেন দরদি মনের। দয়ালু মানুষ। হয়তো খবর পেলেন কারও ঘরে খাবার নেই কিংবা আলো জ্বালাবার কেরোসিন নেই, মা ঠিক পাঠিয়ে দিতেন। আমার এই কাজের প্রেরণা মায়ের কাছ থেকেই হয়তো পেয়েছি। ভাইবোনদের মধ্যে সবচেয়ে কালো ছিলাম আমি। কালো ছেলেটাকে মা হয়তো একটু বেশিই ভালো বাসতেন। আমার বাবা সিদ্দিক হাসান ছিলেন বাবা-ই। অভিভাবক। কিন্তু আমার ছোট চাচা ছিলেন আমার চিন্তাবন্ধু। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যায় অনার্স পড়ছিলাম। ছোট চাচা তখন লন্ডনে পাকিস্তান দূতাবাসের বাণিজ্যসচিব। তাঁর পরামর্শে স্কটল্যান্ডে গিয়ে গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ে নেভাল আর্কিটেকচারে ভর্তি হলাম। উত্তেজনা ভেতরে, দেশের প্রথম নেভাল আর্কিটেক্ট হব। কিন্তু যখন বুঝলাম, দেশে ফিরে এই পড়াশোনা কাজে লাগবে না, তখন মাঝপর্যায়ে লন্ডনে ফিরে অ্যাকাউন্টিংয়ে ভর্তি হলাম। বাবা মানতে চাননি। কিন্তু ছোট চাচা বললেন, “তুমি যেটা চাও, তাই কর।” কবিতার প্রতি টান বা ভালোবাসাটাও ছোট চাচার কাছ থেকে পেয়েছি। তখন বয়স সাত-আট বছর। ভাইবোনদের মধ্যে নজরুলের কবিতা বা রবীন্দ্রনাথের সোনার তরী মুখস্থের প্রতিযোগিতা দিতেন ছোট চাচা। আমি বরাবর প্রথম হতাম।’
আপনাকে নিয়ে লেখা একটি বইয়ে পড়ছিলাম, আপনি যে বাড়িটায় থাকেন, সেটা ব্র্যাকের বাড়ি। আপনার সন্তানেরা এটার উত্তরাধিকারী নয়।
নিজেকে নিয়ে যখন লোকে খুব বেশি ব্যস্ত হয়ে যায়, তখন অন্যের জন্য কাজ করার ক্ষেত্রে মনোযোগ কমে যায়। কাজেই আমি প্রথম থেকেই চিন্তা করেছি নিজের জন্য কোনো সম্পত্তি করব না, জমিজমা করব না। আমার এক বন্ধু ছিল সেও এটা মানত। ‘এক বাক্সের মধ্যে যা আঁটে, সেটাই তার সম্পত্তি।’ সে ছিল আমেরিকান। সে মারা গেছে। ঢাকা থেকে যখন সে চলে গেছে, তখন কিছুই সে নিয়ে যায়নি। সব দিয়ে চলে গেছে। আমিও সেই নীতিতেই আছি। কোনো ধরনের সম্পত্তির দরকার নেই।
সন্তানেরা এটা মেনে নিয়েছে?
সন্তানেরা ছোটবেলা থেকেই এটা দেখছে, মেনে নিয়েছে। তবে আমি মনে করি, সন্তানদের প্রতি আমার একটা দায়িত্ব আছে। সেটা আমি পালন করেছি। অনেক সময় আমি নিজে টাকা দিতে পারিনি, আত্মীয়েরা টাকা দিয়েছে। ছেলে শামেরন আবেদ ব্যারিস্টারি পাস করে এসেছে। প্রথমে যোগ দিয়েছিল নিউ এজে। এখন আছে ব্র্যাকে। মেয়ে তামারা আবেদ আড়ং দেখছে।
তারা বাবাকে সমালোচনা করে না?
সব সময়ই সমালোচনা করে। আমার সমালোচনা করার জন্য ওই দুজনই আছে।
সন্তানদের কথা শোনেন?
অবশ্যই শুনি। কথামতো যে চলি, তা না, কিন্তু শুনতে তো অসুবিধা নেই।
আর বন্ধুদের কথা?
বন্ধু তো অনেক। বিদেশি বন্ধু আছে অনেক। যাঁরা ১৯৭২ সাল থেকে এখনো আছেন। এই যেমন হার্ভার্ডের অধ্যাপক রিচার্ড ক্যাশ। তিনি ১৯৭২ সালে আমাদের সঙ্গে কাজ করেছেন। এসেছিলেন অন্য সংগঠনের পরিচালক হয়ে। ১৯৬৭ সাল থেকেই তাঁর সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব। আইসিডিডিআরবিতে কাজ করতেন। ওখানে পানিশূন্যতা ও খাবার স্যালাইন আবিষ্কার করেছেন যাঁরা, তিনি তাঁদের মধ্যে একজন। তিনি বিজ্ঞানী। এখনো তিনি এসে আমাদের স্কুল অব পাবলিক হেলথে পড়ান। তিনি ৪০ বছর ধরে আমাদের বিভিন্ন স্বাস্থ্য প্রকল্পে সহায়তা দিচ্ছেন। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছেন। হার্ভার্ডেও পড়ান। তিনি মার্কিন। কোল্ড পি. ডজ বলে একজন আছেন, যিনি এখানে ইউনিসেফের প্রতিনিধি ছিলেন। তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ১৯৭৪ সালে। তখন তিনি অক্সফামের পরিচালক হিসেবে বাংলাদেশে এসেছিলেন। পরিচয় হয়, বন্ধুত্ব হয়। এখন তিনি অবসর নিয়েছেন ইউনিসেফ থেকে। এখনো প্রতিমাসে তিনি আসেন। ব্র্যাকের জন্য বিভিন্ন কাজ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা একজন অর্থনীতি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান চাই। তিনি বলেন, আমি নিউইয়র্কে গিয়ে দেখি বাংলাদেশের ভালো কেউ আছেন কিনা। আরও অনেক আছে। বাংলাদেশি তো আমাদের সংগঠনে অনেকেই কাজ করেছেন। ইশতিয়াক আহমেদ, আমাদের আইনজীবী ছিলেন। তিনি অনেক রকম কাজ করেছেন। ড. কামাল হোসেন আমাদের অনেক রকম আইনি সহায়তা দিয়েছেন। আমার বন্ধু ছিলেন সালমা সোবহান। তাঁর সঙ্গে মিলে আমরা আইন ও সালিশ কেন্দ্র সংগঠনটিও করি। আমি একসময় তার চেয়ারম্যানও ছিলাম।
জীবনে কি কখনো কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছেন? যদি ভুল হয়, তখন কি করেন?
ভুল হয়েছে বুঝতে পেরে প্রথমেই সেটা স্বীকার করে নিই। ভুল থেকে কিছু শিখি। ভুল হয়ে গেলে যে পরাজিত হয়ে গেলাম, সেটা আমি মনে করি না। একবার আমি চিন্তা করলাম, সারা দেশে ২৫ মিলিয়ন গাছ লাগিয়ে আমি সে আয় দিয়ে প্রায় আড়াই লাখ নারীকে রেশম পোকা পালার কাজ দেব। কিন্তু এই যে ২৫ মিলিয়ন গাছ লাগানো হলো, পরপর দুই বছরের বন্যায় সব নিঃশেষ হয়ে গেল। তখন আমার মনে হলো, চিন্তাভাবনা না করে এত গাছ লাগালাম, এত টাকা খরচ করলাম, ১৩ হাজার মহিলা ১৩ হাজার কিলোমিটার রাস্তা পাহারা দিল, কিন্তু প্রকল্পটিতে লোকসান হলো, তো তখন মনে হলো এ রকম একটা বড় প্রকল্প নেওয়ার আগে কতগুলো ছোট ছোট ‘পাইলট প্রকল্প’ নেওয়া উচিত ছিল। ফাস্ট বি এফেক্টিভ, দেন বি এফিশিয়েন্ট, দেন স্কেল আপ অর এক্সপান্ড।
আপনি বলেছেন, আপনার রাজনীতিতে আসার ইচ্ছে নেই, তাই কি?
একেবারেই নেই।
তবুও ধরুন, যদি আপনাকে রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালন করতে হয়, দেশের কোন ক্ষেত্রে আপনি সবার আগে নজর দেবেন?
প্রথমেই শিক্ষা।
আমাদের সংস্কৃতি নিয়ে আপনার কিছু ভিন্ন ভাবনা আছে।
আমার চিন্তাভাবনা একটু অন্য। আমি ব্যাখ্যা করি। রবীন্দ্রনাথকে আমরা ভালোবাসি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে পড়ে, বুঝে চিন্তা করার লোক, আনন্দ পাওয়ার লোক কত শতাংশ আছে বাংলাদেশে? নিরক্ষর বাঙালি তো বেশি। যত দিন পর্যন্ত বাংলার প্রতিটি মানুষ সংস্কৃতির আওতায় না আসবে, তত দিন পর্যন্ত এই সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে, যেন শিক্ষিত হয়। আমি চিন্তা করেছিলাম, আমাদের এক গাড়ির চালক, ষষ্ঠ শ্রেণী পাস, সামান্য পড়াশোনা পারে, তাদের জন্য বই প্রকাশ করব। রবীন্দ্রনাথের কাব্য, মধুসূদনের কাব্য, শরত্চন্দ্রের উপন্যাস, যত ক্লাসিক আছে, তা সহজ ভাষায় প্রকাশ করব। ৫০টি বই প্রকাশও করেছি। বাংলাদেশে ক্ল্যাসিক, বোঝে তো মাত্র পাঁচ শতাংশ মানুষ। কিসের সংস্কৃতিমনা বাঙালি? যদি বলি, বাংলাদেশের অর্ধেকের বেশি লোক এসব নিয়ে কিছুই জানে না? তাই আমি জনসংখ্যার একটা ছোট অংশ নিয়ে গর্ব করতে চাই না। যত দিন পর্যন্ত এটা না ছড়াবে, তত দিন পর্যন্ত আমি বাঙালির সংস্কৃতি বিষয়ে সন্দিহান। বাঙালি সংস্কৃতি একটি ছোট গন্ডির মধ্যে থাকবে আর তারা দম্ভ করে বলবে, আমরা সংস্কৃতিবান! নিজেদের মধ্যেই বুদ্ধিজীবী হয়ে আমরা খুশি থাকব! আমরা নাটক করছি, ধনীর সন্তানদের জন্য পাপেট শো করছি, গরিবের সন্তান যে পড়তেই পারছে না, তা নিয়ে কারও চিন্তা নেই। আমাদের সাংস্কৃতিক আন্দোলনটা এখনো অভিজাত শ্রেণীর হাতে। এ জন্য আমি তাদের সংস্পর্শে যাই না, আমি আমার কাজ করে যাই। আমি স্কুলে শিক্ষা দেব আগে। আমরা ১৯০০ লাইব্রেরি করেছি, এই পাঠাগারগুলোয় হারমোনিয়াম-তবলা দিয়েছি। আমি প্রত্যেকটি বাচ্চাকে সংগীতের অভিজ্ঞতা দিতে চাই।
কার গান ভালো লাগে?
রবীন্দ্রসংগীতের ওপর তো কিছু হয় না। দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া গান ভালো লাগে। পশ্চিমা সংগীত ভালো লাগে।
কখন গান শোনেন?
আমি সবসময়ই গান শুনতে ভালোবাসি। কাজের ঘরেও শুনি, বাড়িতেও শুনি। গানের আসরেও যাই।
মন খারাপ হলে কী করেন?
বই পড়ি। কবিতা পড়ি। কবিতা আমাকে অনেক ভালো রাখে।
গোপন একটা কবিতার খাতা কি আপনার নেই?
উঁচুদরের কবিতা পড়ছি আর নিচুদরের কবিতা লিখছি, সেটা হবে না। আমি যখন দেখলাম, আমার কবিতার সেই মেধা নেই-ই, তখন বুঝলাম অন্যরাই কবিতা লিখুক। আমি বরং পড়ি

February 27, 2010 Posted by | Uncategorized | Leave a Comment

প্রমিত বাংলা

টেলিভিশনের খবর দেখছিলাম। হঠাৎই একটা খবর কানে এল। তথ্য মন্ত্রণালয় গণমাধ্যমের কর্তাব্যক্তিদের এক পরামর্শসভায় ডেকেছে। তাতে গণমাধ্যমগুলোকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বাংলা ভাষার বিকৃতি রোধে ভূমিকা রাখতে। জগাখিচুড়ি ভাষা, অশুদ্ধ ভাষা প্রচারের মাধ্যমে ভাষার দূষণ যেন কেউ না ঘটায়। যদি কেউ এ ধরনের বিকৃতি ঘটাতেই থাকে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। টেলিভিশনে শোনা খবর স্মৃতি থেকে বললাম। ‘কঠোর ব্যবস্থা’র হুঁশিয়ারিটা স্পষ্ট মনে আছে। বাকি কথাগুলো হুবহু কী ছিল, তা ঠিকঠাক বলতে পারছি, এমন নয়। তবে অন্তর্নিহিত বার্তাটা এ রকমই।
বাংলা ভাষার প্রতি আমাদের যে গভীর মমত্ববোধ, সেটা খুবই খাঁটি একটা জিনিস, বানিয়ে তোলা কিছু নয়। তথ্য মন্ত্রণালয়ের এই উদ্যোগও সেই আন্তরিক ভালোবাসা, বেদনা ও উদ্বেগেরই প্রকাশ। তবে ধমক দিয়ে, পরামর্শ দিয়ে বা কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের হুমকি দিয়ে সৎ উদ্দেশ্যও চরিতার্থ হবে কি না, এ বিষয়ে সন্দেহ থেকেই যায়।
এ বিষয়ে গণমাধ্যমগুলোর নিজেকেই দায়িত্বশীল হতে হবে সবার আগে। গণমাধ্যমের কাজ কী— পাঠ্যপুস্তকে লেখা আছে—গণমাধ্যম তথ্য দেবে, বিনোদন দেবে, শিক্ষা দেবে, আর প্রেরণা জোগাবে। কাজেই শ্রোতা বা দর্শক বা পাঠককে সুশিক্ষা দেওয়া, উন্নতির পথে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করার দায় প্রতিটা গণমাধ্যমের ওপরে আপনাআপনিই বর্তায়। আর সেই দায়িত্ব গণমাধ্যমকে নিজের গরজে, নিজের দায়বোধ থেকেই করতে হয়। সরকার খবরদারি করে সেটা করতে পারবে বলে মনে হয় না। এটা সরকারের কাজও নয়। সৃষ্টিশীলতার কাজে সরকারের সব চেয়ে ভালো ভূমিকা হলো সবচেয়ে কম জড়িত হওয়া, কম হস্তক্ষেপ করা।
গণমাধ্যম তার নিজের ওপরে অর্পিত পাবলিক ট্রাস্টের দায় এড়াতে পারে না। আমাদের বেতারের উপস্থাপকেরা মান বাংলায় কথা বলতে জানবেন, প্রমিত কথ্যভাষা বলায় তাঁরা হয়ে উঠবেন একেকজন আদর্শ, এটা বেশ জোরের সঙ্গেই আমরা দাবি করতে পারি। এবিসি রেডিওতেও যথাসম্ভব প্রমিত বাংলা ব্যবহার করা হয় ও ইংরেজি শব্দ পরিহার করা হয়, কিন্তু তাতে এই বেতারটির জনপ্রিয়তা কমেনি, বরং খুবই অল্প সময়ের মধ্যে বেতারটি শ্রোতাদের মনে একটা স্থান অধিকার করে নিতে পেরেছে। প্রথম আলোরও সম্পাদকীয় নীতি হলো, ইংরেজি শব্দ পারতপক্ষে ব্যবহার না করা। কই, প্রথম আলোর জনপ্রিয়তা তো কমেনি, বরং প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। গণমাধ্যম কর্তৃপক্ষকে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। যখন একজন উপস্থাপক নেওয়া হয়, তখন তাঁকে পরীক্ষার মাধ্যমে বাছাই করে নিশ্চিত হতে হবে যে, তিনি মান বাংলাটা সঠিকভাবে বলতে পারেন। একই কথা টেলিভিশন চ্যানেলের জন্যও প্রযোজ্য। অনেকগুলো অনুষ্ঠান, বিশেষ করে ব্যান্ডের গানের অনুষ্ঠানের উপস্থাপকেরা বাংলা বলেন, নাকি হিন্দি বলেন, নাকি ইংরেজি বলেন, বোঝা খুবই দুষ্কর। আর এত ইংরেজি শিরোনামের অনুষ্ঠানই বা কেন?
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তথ্য মন্ত্রণালয় বা সরকারের কোনো মন্ত্রণালয় এগুলোকে পাহারা দিয়ে রাখতে পারবে কি না? এটা তার কাজ কি না? কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়াটা মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে কি না! আমরা গণমাধ্যমের নিরঙ্কুশ স্বাধীনতার পক্ষে এবং সরকারের ন্যূনতম হস্তক্ষেপেরও বিরুদ্ধে। আমেরিকা পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ। ওই দেশের সংবাদমাধ্যমে কোনো ধরনের সরকারি হস্তক্ষেপ সাংবিধানিকভাবে নিষিদ্ধ। ইউনাইটেড স্টেটস ইনফরমেশন এজেন্সি প্রকাশিত আনফেটারড প্রেস গ্রন্থে বলা হয়েছে, ‘একটা সংবাদপত্রের অধিকার আছে ছিদ্রান্বেষী, দলীয় পক্ষপাতদুষ্ট, অথবা অসত্যবাদী, সংকীর্ণতাবাদী, অথবা যা খুশি তাই হওয়ার, যা তার বিবেক তাকে হতে বলে।’ (পৃষ্ঠা ৩৫)। আমেরিকায় একটা সংবাদমাধ্যম মিথ্যা কথা বলারও অধিকার রাখে। কেন তারা সংবাদমাধ্যমকে এই স্বাধীনতা দিয়েছে? না হলে সরকার খবরদারি করবে, বলবে তুমি মিথ্যা বলছ। সরকারি খবরদারির একটা অজুহাত তৈরি হবে মাত্র। সেটা সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করবে। তার বদলে পাঠক সিদ্ধান্ত নিক, কোনটা সত্য কোনটা মিথ্যা। মিথ্যা কথা বলে কোনো সংবাদমাধ্যম শেষতক গ্রহণযোগ্যতা পায় না। তো এই অবাধ স্বাধীনতা দিয়ে আমেরিকা কি তার রাষ্ট্রটাকে ধ্বংস করে দিয়েছে? নাকি তারাই আজ পৃথিবীর এক নম্বর শক্তি হিসেবে টিকে আছে?
তার পরের প্রশ্ন হলো, কোনটা প্রমিত কোনটা প্রমিত নয়, এটা ঠিক করবে কে? ভাষা তো বহমান একটা জিনিস, এটা স্থির নয়। আজ যাকে প্রমিত বলছি, ১০০ বছর আগে সেটা প্রমিত ছিল না, ১০০ বছর পরেও থাকবে না। প্রমথ চৌধুরী বলেছেন, ‘ভাষা মানুষের মুখ হতে কলমের মুখে আসে, কলমের মুখ হতে মানুষের মুখে নয়। উল্টোটা করতে গেলে মুখে শুধু কালি পড়ে।’ (প্রমথ চৌধুরী, কথার কথা, প্রবন্ধসংগ্রহ)। আমি লেখার সময় বাংলা একাডেমীর প্রমিত বানান অভিধান মেনে চলি, কিন্তু বাংলাদেশের বহু গুরুত্বপূর্ণ লেখক আছেন, যাঁরা ওই বানানরীতি মানেন না। তাঁদের কি আমরা বলতে পারব, আপনারা আইন লঙ্ঘন করছেন? বানানের ক্ষেত্রেই যদি আমরা বাংলা একাডেমীর প্রমিত বানান অভিধান সবাইকে মানতে বাধ্য করতে না পারি, তাহলে উচ্চারণের ক্ষেত্রে কীভাবে পারব? প্রমিত বাংলা নষ্ট হয়ে যাবে, এই ভয়ে কি আমরা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের চরমপত্র পাঠ নিষিদ্ধ করে দেব? অথচ ওইটাই ছিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় অনুষ্ঠান! আমরা কি বেতারে কি টেলিভিশনে ভাওয়াইয়া-ভাটিয়ালি-লালন-হাসন প্রচার করব না! আমরা কি সাতই মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণের ‘দাবায়া রাখতে পারবা না’ বাক্যটাকে সম্পাদিত করে ‘দাবিয়ে রাখতে পারবে না’ করতে বলব? অসম্ভব। আমরা কি টেলিভিশন নাটক নির্মাণের সময় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মানদীর মাঝির সংলাপ বা দীনবন্ধু মিত্রের নীলদর্পণ নাটকের সংলাপ বদলে প্রমিত মান বাংলা করে দেব? আবার আমাদের সংবিধান লেখা সাধু ভাষায়, আমরা কি তাহলে সাধু ভাষাকে প্রমিত ভাষা ধরে নিয়ে বেতার-টেলিভিশনে সাধু ভাষা বাধ্যতামূলক করব? রবীন্দ্রনাথের একটা গল্প ‘ল্যাবরেটরি’ থেকে তিনটা বাক্য উদ্ধৃত করি, খেয়াল করে দেখুন তিনি কত ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করেছেন, ‘নন্দনকিশোর ছিলেন লন্ডন য়ুনিভার্সিটি থেকে পাস করা এঞ্জিনিয়ার। যাকে সাধুভাষায় বলে দেদীপ্যমান ছাত্র, অর্থাত্ ব্রিলিয়ান্ট, তিনি ছিলেন তাই।…এসব দেনা-পাওনা নাকি কোম্পানি নামক একটা অ্যাব্স্ট্রাক্ট সত্তার সঙ্গে জড়িত…।’ এখন রবিবাবুর এই গল্পকে জগাখিচুড়ি ভাষা বলে আমরা বাতিলের খাতায় পাঠাতে পারব কি?
তাই বলি, প্রথমেই একটা সীমারেখা টানতে হবে। তা হলো, সৃজনশীল এলাকা আর আনুষ্ঠানিক এলাকা। শিল্পী-সাহিত্যিক-নাট্যকারেরা স্বাধীনভাবে লিখবেন। একটা বেতার বা টেলিভিশন বা সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় নীতি বলে দেবে, এটা তারা প্রকাশ বা প্রচার করতে পারবে কি না। যেমন হাসান আজিজুল হক একটা অপূর্ব উপন্যাস লিখেছেন আগুনপাখি নামে। এটা প্রথম আলোর বর্ষসেরা বইয়ের পুরস্কার পেয়েছে এই বাংলাদেশে, পশ্চিমবঙ্গে পেয়েছে আনন্দ পুরস্কার। বইটা লেখা হয়েছে রাঢ় অঞ্চলের কথ্য ভাষায়। ‘আমার মায়ের য্যাকন মিত্যু হলো আমার বয়েস ত্যাকন আট-ল’ বছর হবে। ভাইটোর বয়েস দেড়-দু বছর। এই দুই ভাই-বুনকে অকূলে ভাসিয়ে মা আমার চোখ বুজল। ত্যাকনকার দিনে কে যি কিসে মরত ধরবার বাগ ছিল না।’ পুরো বইটার বর্ণনা এই ভাষায়। এটাকে তো আপনি প্রমিত নয় বলে নিষিদ্ধ করে দিতে পারেন না।
আমরা কি টেলিভিশনে পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়, নূরলদীনের সারাজীবন বা হাতহদাই প্রচারে বাধা দেব? নাটকের সংলাপ হবে চরিত্রানুগ, সেটা দীনবন্ধু মিত্রও লিখেছেন, মধুসূদন দত্তও লিখেছেন, সেটা নিয়ে কোনো বিতর্ক কখনো ছিল না, আশা করি এখনো নাই। আবার সৃষ্টিশীল লেখক তাঁর বর্ণনার ভাষাও নিজের মতো করে তৈরি করে নিতে পারেন, আঞ্চলিক ভাষায় লিখতে পারেন—আইন করে সেটাকে ঠেকানোর কথা কেউ কল্পনাও করে না।
কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে যখন আমরা বেতারে বা টেলিভিশনে কথা বলব, শ্রেণীকক্ষে বা আলোচনা সভায় বক্তৃতা করব, আমরা তখন প্রমিত কথ্য ভাষা ব্যবহারের চেষ্টা করব ১০০ ভাগ। সেখানে যখন অন্যথা দেখি, আমরা আমাদের উদ্বেগের কথা নিশ্চয়ই জানাব। আমাদের কোনো পরামর্শ থাকলে সেটা দেবও। আমরা চাইব, আমাদের সংবাদপাঠকেরা প্রমিত বাংলায় খবর পরিবেশন করবেন। আমরা চাইব আমাদের আলোচনা অনুষ্ঠানগুলোর আলোচকেরা মান বাংলায় আলোচনা করবেন। কিন্তু সেটাও পাহারা দিয়ে রাখা মুশকিল। আমরা কি আমাদের জাতীয় সংসদের মাননীয় স্পিকার আবদুল হামিদের সংসদে বলা উক্তিগুলো প্রচার করব না? নিশ্চয়ই করব। অসাধারণ দক্ষতায় তিনি সংসদ পরিচালনা করেন এবং তাঁর মুখের কথা শুনতে আমাদের ভালো লাগে।
বলতে চাচ্ছি, এটা অসম্ভব যে কোন বেতারে, কোন টেলিভিশনে, কোন সংবাদপত্রে দূষণীয় ভাষা পরিবেশিত হচ্ছে, সরকারের পক্ষে তা পাহারা দিয়ে রাখা, তা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা। এ ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমকেই যথেষ্ট দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। যে যত জনপ্রিয় হবে, তাকে তত বেশি দায়িত্বশীল হতে হবে। এমনকি শিল্পীরও দায়িত্ব আছে। দায়বদ্ধতা আছে। শিল্পী নিশ্চয়ই এ বিষয়ে সচেতন হবেন।
প্রমিত বাংলা আমাদের শিখতে হবে। আমরা শুদ্ধ বাংলা বলতে ও লিখতে পারার কষ্টটা স্বীকার করব না, এটা খুব কাজের কথা নয়। আমাদের স্কুলগুলোকে, আমাদের নাগরিকদেরকে এ ব্যাপারে দায়িত্ব পালন করতে হবে। পাশাপাশি এটাও বলি, আঞ্চলিক ভাষা বাংলা ভাষার শত্রু নয়, আঞ্চলিক ভাষা বাংলার প্রধান সম্পদ। এটাকে যেন আমরা অবহেলা না করি, আঞ্চলিক ভাষায় যাঁরা কথা বলেন, তাঁদের যেন আমরা হেয় না করি। আমাদের যেন আবার লিখতে না হয়, ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়।’ একুশের চেতনা মানে বহুস্বরের চেতনা, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের চেতনা আমাদের ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর ভাষাগুলোকেও গুরুত্ব ও মর্যাদা দেওয়ার চেতনা। সংস্কৃতি মানে কেবল কেন্দ্রের বা মধ্যবিত্তের স্বর নয়, শাসক শ্রেণীর স্বর নয়; প্রান্তেরও স্বর, শত ফুল ফুটতে দেবার সাধনা, গরিব মানুষ, কৃষক-শ্রমিক মেহনতি মানুষের কণ্ঠস্বরও যেন আমাদের শিল্প-সাহিত্য-গণমাধ্যমে স্থান পায়। আমরা যেন কথায় কথায় হাতে-পায়ে শেকল পরানোর ভুল চেষ্টা না করি।
বাংলা ভাষার প্রধান শত্রু কে? আমাদের আঞ্চলিক ভাষাগুলো মোটেও নয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ যে বিভিন্ন উপভাষায় কথা বলেন, সেসবের বদলে রাষ্ট্র একটা কেন্দ্র-নির্দেশিত ভাষা প্রবর্তন করবে, এই চিন্তার মতো স্বৈরাচারী ও একুশের চেতনাবিরোধী আর কিছুই হতে পারে না। বাংলা ভাষার প্রধান শত্রু বিশ্বায়নের চাপে মুক্তবাজারের খোলা দরজা-জানালা দিয়ে ঢুকে পড়া পণ্যবাদী সংস্কৃতির আগ্রাসন। সরকারের এসব ক্ষেত্রে করার আছে অনেক কিছু। একবার এই দেশে আইন করা হয়েছিল, অফিস-আদালত, দোকানের নামফলক বাংলায় লিখতে হবে। সাইনবোর্ডে বাংলা থাকতে হবে, এই আইনটা যদি থেকে থাকে, তাহলে সেটাকে পুরোপুরি কার্যকর করা হোক, যদি না থাকে, তাহলে এই আইন আবার চালু করতে হবে। বাংলা ভাষার আরেকটা বড় শত্রু অবশ্যই হিন্দি টেলিভিশন চ্যানেলগুলো। আমাদের মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো আর বাংলাদেশের চ্যানেল দেখে না। তথ্য মন্ত্রণালয় যদি সত্যি সত্যি বাংলা ভাষার জন্য একটা কিছু করতে চায়, তাহলে তার প্রথম কাজ হওয়া উচিত এই দেশে হিন্দি চ্যানেলের ওপরে বিধিনিষেধ আরোপ করা। এটা ভীষণ অজনপ্রিয় একটা পদক্ষেপ হবে, কারণ আমরা এই হিন্দি ধারাবাহিকগুলোতে মাদকের মতো নেশাসক্ত হয়ে পড়েছি। শিশুদের একটা হিন্দি চ্যানেলে হিন্দি কার্টুন দেখানো হয়, ওর দ্বারা শিশুরা বাংলা বলা ভুলে যাচ্ছে। এটা অবিলম্বে বন্ধ করে দেওয়া উচিত। আমাদের ভোগ্যপণ্যগুলোর মোড়কে বাংলা লেখা থাকা বাধ্যতামূলক করা যায়। আমাদের বিজ্ঞাপনচিত্রে ইংরেজির ব্যবহার সহজেই বন্ধ করে দেওয়া যায়। এসব পদক্ষেপ যদি তথ্য মন্ত্রণালয় গ্রহণ করে, বাংলা ভাষার ভীষণ উপকার হবে। অফিস-আদালতে বাংলা ব্যবহারের সাংবিধানিক অঙ্গীকার পালনে আন্তরিক হতে হবে সরকারকেই। প্রথম আলো ২০১০ একুশে সংখ্যায় মিশা হোসেন একটা চমত্কার প্রবন্ধ লিখেছেন, আজকে দেশের মানুষ ইংরেজি জানা ও ইংরেজি না জানা এ দুই শ্রেণীতে ভাগ হয়ে যাচ্ছে। বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। একুশের চেতনা হলো বৈষম্যহীনতা, রাষ্ট্রকে এই বৈষম্য বিলোপে কাজ করতে হবে। আমাদের ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়গুলোয় ভারতের ইতিহাস পড়ানো হয়, ব্রিটেনের ইতিহাস পড়ানো হয়, তাদের বাংলার ইতিহাস পড়াতে হবে। সেসব না করে রাষ্ট্র যদি বহু মানুষের কণ্ঠস্বরকে সংস্কৃতিতে আসতে বাধা দেয়, তা হবে পণ্ডশ্রম, তা আমাদের মনে করিয়ে দেয় শহীদ কাদরীর কবিতা, ‘রাষ্ট্র মানেই লেফ্ট রাইট লেফ্ট রাইট।’ একুশের চেতনা এ রকম লেফট রাইট মার্কা রাষ্ট্র নয়, একটা বৈষম্যহীন উদার অসাম্প্রদায়িক সুখী আলোকিত মুক্ত রাষ্ট্র—যে রাষ্ট্রে বর্ণমালা যাবে প্রতিটা ভূমিহীনেরও ঘরে, ভূমিহীনের কণ্ঠস্বরও ধ্বনিত হবে জাতীয় গণমাধ্যমে।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক, সাংবাদিক।

প্রথম আলো ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০১০

February 23, 2010 Posted by | Uncategorized | Leave a Comment

WordPress Post by Email : Generating a Post by Email Address


Post by Email is a way of publishing posts on your blog by email. Any email client can be used to send the email, allowing you to publish quickly and easily from devices such as cell phones.

  • [category x,y,z]
  • [excerpt]some excerpt[/excerpt]
  • [tags x,y,z]
  • [delay +1 hour]
  • [comments on | off]
  • [status publish | pending | draft]
  • [password secret-password]
  • [slug some-url-name]
  • [title Your post title]
  • [end] – everything after this shortcode is ignored (i.e. signatures)
  • [nogallery] – disables the auto-gallery and displays all images inline

November 21, 2009 Posted by | Uncategorized | , , , , , | Leave a Comment

Converting a String to a Date in VB.Net

How can I convert this string to a date in format (“dd/mm/yyyy”)

> without turning off Option Strict?

via Converting a String to a Date in VB.Net.

November 21, 2009 Posted by | Uncategorized | Leave a Comment

More Than 2700 Free Joomla CMS Templates

Welcome to Joomla24, the Downloadbase for Joomla Templates. In collaboration with the biggest german Downloadbase “www.joomlaos.de” we offer more than 2700 Templates with live preview for Joomla. If you would like to offer your Template or other News for Download please submit it. Our Downloadbase is waiting for your offers.

via More Than 2700 Free Joomla CMS Templates.

November 3, 2009 Posted by | VB2008 Sample Code | Leave a Comment

mail post

this is a post from mail

November 3, 2009 Posted by | Uncategorized | Leave a Comment

Follow

Get every new post delivered to your Inbox.