Skpaul

For HumanKind

ব্র্যাকের কর্ণধার ফজলে হাসান আবেদ : চিন্তা এবং চেতনায়

ব্র্যাকের কর্ণধার ফজলে হাসান আবেদ। সম্প্রতি পেয়েছেন নাইট উপাধি। পুরস্কার বা সম্মান নতুন কিছু নয়, তাঁর জন্য। ব্র্যাকের কাজ শুরু করার আট বছরের মাথায় ১৯৮০ সালে তিনি পেয়েছিলেন র্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার। ১৯৭০-এর ঘূর্ণিঝড়ের পর থেকে ত্রাণ ও পুনর্বাসনের কাজের সঙ্গে যুক্ত এই মানুষটিকে জানতে চাই আমরা। দেখি, ভেতরে বাস করে এক কবি মানুষ।

‘কবি হতে চেয়েছিলাম, কিন্তু সবাই তো আর কবি হতে পারে না, তবে কবিতার প্রতি টান আমার এখনো আছে। রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ দাশ থেকে শুরু করে একেবারে তরুণ কবির কবিতাও আমি পড়ি। এখন সবচেয়ে বেশি পড়ি অবশ্য শেকসপিয়র। চার্লস ডারউইন বলেছিলেন—বিবর্তনবাদ নিয়ে ৩০ বছরের কাজের সাধনার কারণে সবচেয়ে বড় যে ক্ষতিটা তাঁর হয়েছে, তা হলো শেকসপিয়র পড়ে তিনি আর আগের মতো আপ্লুত হন না। আমি সারাক্ষণই শেকসপিয়র আওড়াই। শেকসপিয়রের হাজার হাজার লাইন আমি এখনো মুখস্থ বলতে পারি।’…কথাগুলো বলছিলেন ফজলে হাসান আবেদ।
বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের কর্ণধার এই মানুষটির জন্য পুরস্কার বা সম্মানপ্রাপ্তি নতুন কিছূ নয়। সম্প্রতি তিনি নিজের জন্য, প্রতিষ্ঠানের জন্য, দেশের জন্য যে সম্মানটি বয়ে এনেছেন তা হলো ‘নাইট’ উপাধি। বিনয়ের সঙ্গে বলছিলেন, ‘আমি কখনই মনে করি না, পুরস্কার বা সম্মান আমার একার অর্জন। কোনো পুরস্কার পেলে আমি সবচেয়ে বেশি গর্ববোধ করি ব্র্যাকের কর্মীদের জন্য। কারণ পুরস্কার পাওয়ার আনন্দে তারা খুবই উত্ফুল্ল হয় এবং তাদের কাজের গতি বেড়ে যায়।’ ১৯৮০ সালে র্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার ছিল ফজলে হাসান আবেদের পাওয়া প্রথম আন্তর্জাতিক পুরস্কার। ব্র্যাকের কাজ শুরু হওয়ার মাত্র আট বছরের মাথায় এই পুরস্কার পান তিনি।
১৯৭০-এর ১২ নভেম্বরের সেই ঘূর্ণিঝড় ফজলে হাসান আবেদের মনেও ঝড় তোলে। চারদিকে লাশ, হাজার হাজার মানুষ অসহায়, অনিশ্চিত জীবনযাত্রা, ভঙ্গুর জীবন…গড়ে তুললেন একটি প্রতিষ্ঠান ‘হেল্প’। তখন তিনি শেলওয়েল কোম্পানিতে চাকরি করেন। ভাবলেন, একপর্যায়ে ‘হেল্প’-এ এসে পুরোপুরি যোগ দেবেন। এরই মধ্যে ১৯৭১। সে সময় গভর্নর ছিলেন টিক্কা খান। এপ্রিল মাসে ফজলে হাসান আবেদকে বলা হলো, সারা দেশে গ্যাস বিতরণ এবং তেলবাহী জাহাজ ভেড়া নিশ্চিত করা, এসব কাজের জন্য গভর্নর অফিসে সমন্বয়কের (লিয়াজোঁ অফিসার) দায়িত্ব পালন করতে। কিন্তু তাঁর মনে হলো, ‘আমি এই মিলিটারির চাকরি করব নাকি!’ দুই-একদিন পরই তাঁকে দেওয়া হলো বাঘ মার্কা একটি সরকারি পরিচয়পত্র। এই পরিচয়পত্রটি নিয়ে তিনি পাকিস্তান চলে গেলেন। পরবর্তী সময়ে আফগানিস্তান হয়ে লন্ডন। লন্ডনে গিয়ে ‘অ্যাকশন বাংলাদেশ’-এর কাজ শুরু করলেন। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত তৈরি করা, প্রচারণাপত্র বিলি করা, পথনাটক, টাইমস অব লন্ডনে লেখা, বিজ্ঞাপন প্রকাশ থেকে শুরু করে তহবিল সংগ্রহ। অতঃপর যুদ্ধ শেষ। স্বাধীন বাংলাদেশে ফেরা। রাস্তাঘাট, সেতু নেই। একা সরকারের পক্ষে সব জায়গায় পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা, সব সমস্যার সমাধানও সম্ভব নয়। তখন সীমিত উদ্যোগেই একটি অঞ্চলে কাজ শুরু করা হলো। বেছে নেওয়া হলো সুনামগঞ্জের হিন্দু-অধ্যুষিত শাল্লা থানা। এখানে পাকিস্তানি বাহিনীর অত্যাচারের মাত্রা ছিল বেশি। অঞ্চলের বাসিন্দারা যুদ্ধের সময় ভারতে চলে গিয়েছিল। ফিরে এসে দেখে, ঘরবাড়ি নেই, গরু নেই, বীজ নেই। গ্রামকে গ্রাম উজাড়। এত দুর্গম এলাকা যে ঢাকা থেকে কোনো সাহায্যও পৌঁছবে না সেখানে। জেলেরাই এ অঞ্চলে প্রধানত বেশি থাকে। অতঃপর ওখানেই কাজ শুরু করলেন ফজলে হাসান আবেদ।
বলছিলেন, ‘ওখানে ২০-২৫ জন যুবক, যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে বা পাস করেছে, তাদের নিয়ে জরিপ করলাম, কত ঘরবাড়ি নাই? কয়টা গরু নাই? ওখানে একটাই ফসল হয়, বোরো ফসল। ওই সময়ের মধ্যে যদি ওরা ফসল ফলাতে না পারে, তাহলে অনাহারে থাকবে। আমরা দেখলাম, ওদের গরু নেই। এত গরু এনে যে চাষ করব, তার সময়ও ছিল না। তাই যেখানে যেখানে পাওয়ার টিলার পাওয়া যায়, তা এনে কর্ষণ করা হলো জমি। বোরো ধান যাতে হতে পারে। বোরো ধান যদি মার্চের দিকে না লাগানো হয়, তাহলে আর হয় না। আশপাশের গ্রাম থেকে জলি ধানের বীজ সংগ্রহ করে ওদের সরবরাহ করা হলো, যেন প্রথম একটা ফসল আসে। তারপর মাছ ধরার নাইলন জাল নিয়ে এলাম জাপান থেকে, নৌকা বানানোর কাঠ নিয়ে এলাম আসাম থেকে, কুশিয়ারা নদী দিয়ে ভাসিয়ে। বাঁশ আনা হলো ২২ লাখ, যেন ঘর বানানো যায়। সিআই শিট নিয়ে এলাম জাপান থেকে, ১২০০ টন। এগুলো নিয়ে এসে ১৮০০০ ঘর বানানো হয়েছিল। ঘর দেওয়ার ব্যাপারেও একটু সমস্যা হয়েছিল। কোনো কোনো পরিবারে চারজন মানুষ, তিনটা ঘর আছে। কোনো পরিবারে চারজন মানুষ, একটা ঘর। আমরা বললাম, কোনো পরিবারের তিনটা ঘর থাকলেও আমরা দেব একটা ঘর। তিনজনের ওপর সদস্য হলে বড় ঘর, নিচে হলে ছোট ঘর। বড়লোকের জন্য বেশি ঘর দেব, গরিব লোকের জন্য ছোট ঘর দেব, সেটা নয়। একই রকমের ঘর সবার জন্য। এরপর কারও সঙ্গতি হলে সে নিজেই বাকিটা করে নেবে।
প্রথমে আমার বাড়ি বিক্রির টাকা দিয়ে কাজ আরম্ভ করেছিলাম। কিন্তু মাস দুয়েকের মধ্যে লন্ডনের অক্সফাম থেকে লোক এল। জানতে চাইল, আমরা কী করতে চাই? আমরা আমাদের জরিপের ভিত্তিতে প্রকল্পটা দিই। মাসখানেক পর ওরা চিঠি লিখল, আপনাদের এই প্রকল্পে আমরা দুই লাখ পাউন্ড দেব। যখন সে টাকা পেয়ে গেলাম, তখন তো আর সমস্যা থাকল না। চলল প্রায় ১০ মাস।
ইচ্ছে ছিল বছর দুয়েক এখানে থাকব, তারপর আমেরিকা বা ইংল্যান্ডে চলে যাব। কিন্তু এক বছর পর যখন ত্রাণের কাজ শেষ হয়েছে, তখন মনে হলো, যে লোকগুলোকে আমরা সাহায্য করেছি, তাদের এভাবে ফেলে যাওয়া ঠিক হবে না। দারিদ্র্য বিমোচন হবে না। সত্যিকারের দারিদ্র বিমোচন এক বা দুই বছরের কাজ নয়। জীবনের জন্যই এটা একটা দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ব (কমিটমেন্ট) না নিলে এটা করা যাবে না। আমাদের লোকজনকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমরা বহু দিন এই কাজ নিয়ে থাকবে? কেউ কেউ বলল, না পারব না। বললাম, যারা থাকতে না চাও, তারা অন্য চাকরি খোঁজো। তবে অনেকেই থেকে গেল।
দরিদ্র মানুষের উন্নয়ন নিয়ে কয়েকটি উপলব্ধির কথা বলি। একসময় মনে হলো, ত্রাণে উন্নয়ন হবে না, নিজের উন্নয়ন নিজে করতে হবে, সেই পরিবেশ সৃষ্টি করে দেওয়া যাবে, কিছু সুযোগ-সুবিধা তৈরি করে দিতে হবে। ঋণ দিতে হবে। তা খাটিয়ে সে যদি তার নিজের উন্নয়ন করতে পারে, তাকে যদি শিক্ষা দিতে পারি, তাহলে কিছু একটা হয়। অনেকগুলো নৈশবিদ্যালয় চালু করলাম আমরা। কিন্তু দেখলাম, খুব বেশি সাফল্য লাভ করিনি। কারণ, গরিব মানুষ সারা দিন খেটে এসে লণ্ঠনের আলোয় পড়তে চায় না। দুই-একদিন আসে, অক্ষর শিখে গেলে মনে করে আর শেখার দরকার নেই। লেখাপড়া গৌণ, রোজগার মুখ্য। তখন আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম অক্ষরজ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ নয়। নিরক্ষরকে অক্ষরদান করলে তার ক্ষমতায়ন হবে, তা নয়, ক্ষমতায়ন করতে হলে তার সচেতনতা বাড়াতে হবে। সচেতনতা বাড়াতে গিয়ে আমরা নতুন কিছু কৌশল বের করলাম। যেমন একটা শব্দ, উপোস—উ পো স। উপোস নিয়ে আলাপ হয়। উপোস কেন করে লোকে? খাবার নেই। খাবার নেই কেন? জমি নেই। জমি নেই কেন, ওর কেন আছে। এ নিয়ে তো অনেকরকম বিশ্লেষণ করা যায়, তা থেকে একটা উত্তর বেরিয়ে আসে। এসব আলাপের মাধ্যমে আমাদের জীবনযাত্রা, সমাজ কাঠামো নিয়ে আসা যায়।
আশির দশকের পুরোটাই গেছে নারীদের কাউন্সেলিং নিয়ে। ব্র্যাকের পরিচয় প্রথম হলো ডায়েরিয়ার জন্য খাবারের স্যালাইন নিয়ে। সারা দেশেই পরিচিত হয়েছিল। আমরা এক কোটি ৩০ লাখ পরিবারের কাছে গিয়েছি, হাতে-কলমে মাকে শিখিয়েছি। সেটা করতে ১০ বছর লেগেছে। নব্বইয়ের দশকে যখন এই কর্মসূচি শেষ হয়, চিন্তা করলাম, যেই সংগঠন বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি বাড়িতে যেতে পারে, সেই সংগঠন তো যেকোনো কর্মসূচি বাংলাদেশের সর্বত্র নিয়ে যেতে পারে। তখন আমরা আমাদের দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি সম্প্রসারণ করতে শুরু করি সারা বাংলাদেশে।
নারীদের কেন্দ্র করে কর্মসূচি গড়ে তুললেন কেন?
শুরুতে আমাদের কেন্দ্র ছিল পুরুষ-নারী উভয়েই। কিন্তু নারীকে কেন্দ্রে আনার প্রধান কারণ হলো, আমি গ্রামে-গঞ্জে যেতাম প্রায়ই। একটা মেয়ে শিশু, তিন বছর বয়স। সে তার ছয় মাস বয়সী ভাইকে কোলে নিয়ে বসে আছে। তার পাঁচ বছর বয়সী বড় ভাই ঠিকই খেলে বেড়াচ্ছে, কিন্তু মেয়েটা অতি ছোটবেলা থেকেই কিন্তু মানুষ ও বাড়ি সম্পর্কে ব্যবস্থাপনা শিখে ফেলে। ম্যানেজমেন্ট অব পোভার্টি কেন মেয়েরা করে? যে পুরুষ দৈনিক ভিত্তিতে কাজ করে, সে এক দিন কাজ না পেলে টাকা আনে না। সেদিন তো খাওয়া নেই। সে চায়ের দোকানে বা রিকশাওয়ালার সঙ্গে আড্ডা দেয়। বাড়িতে আর আসে না। কিন্তু ঘরে যে তিন-চারটি শিশু আছে, তাদের তো খাওয়াতে হবে মায়ের, নইলে তো ওরা কাঁদবে। আধা সের চাল ধার করবে অথবা কোনো না কোনোভাবে ব্যবস্থা করবে। আমরা কাজের মাধ্যমে আরও জেনেছি, নারীরা সুশৃঙ্খল ও সঞ্চয়ী। তাই দারিদ্র্যব্যবস্থাপনা করছে নারীই। অর্থাত্ যদি দারিদ্র্যের আঘাতটা নারীর ওপরই আসে, তাহলে দারিদ্র্য বিমোচন উন্নয়নের কাজটিও করতে হবে নারীদেরই।
বলা হয়, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সংগঠন ব্র্যাক, এটা আমরা কোনো বিচারে দেখব? সংখ্যাগতভাবে নাকি গুণগত দিক দিয়ে?
প্রথমেই বলি, লোকে জানতে চায়, কতসংখ্যক লোক আপনার সংগঠনে চাকরি করছে। সেদিক থেকে আমরা সবার ওপরে। এক লাখ ২০ হাজারের মতো আমাদের চাকরিজীবী। এটা গেল একটা। আরেকটা পরিসংখ্যান হলো, কতটা ইফেক্টিভ বা কার্যকর। এখন সবাই স্বীকার করে, আমরা সবচেয়ে কার্যকর সংগঠন। বাংলাদেশ নিয়ে পৃথিবীর নয়টি দেশে ব্র্যাক এখন কাজ করছে।
মানুষের জীবনের তো স্বপ্নের একটা পরিধিও থাকে। কতদূর যাব, স্বপ্নটা কতদূর দেখব। এখন ব্র্যাককে যে জায়গায় নিয়ে গেছেন, স্বপ্নটা কি এতদূরই দেখেছিলেন?
বাংলাদেশের বাইরে গিয়ে কাজ করব, সেটা কিন্তু আমি কোনোদিন চিন্তা করিনি। সারা বাংলাদেশে কাজ করব, এটাই ছিল আমার লক্ষ্য। কিন্তু একসময় মনে হলো, বেসরকারি সংগঠন হিসেবে যদি আমি সারা বাংলাদেশে কাজ করতে পারি এবং একটা নতুন মডেল তৈরি করতে পারি, তাহলে আমি সরকারি চাকুরে বা রাজনীতিবিদদের চেয়েও ভালোভাবে বাংলাদেশের সেবা করতে পারব। একজন আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, আপনি রাজনীতিতে না গিয়ে এটা করলেন কেন? বললাম, দেখেন, আমি যদি ভারতবর্ষের লোক হতাম, তাহলে রাজনীতিতে যেতাম। কারণ, ভারতের মতো বড় দেশে কাজ করা বেসরকারিভাবে সম্ভব নয়। কিন্তু বাংলাদেশে সেটা সম্ভব। দেশ পরিবর্তনের জন্য সাধারণত রাজনীতিবিদ ও সোশ্যাল এন্টারপ্রেনাররা চিন্তা করেন। একটি ঐতিহাসিক সময় আমাদের যৌবন কেটেছে। আমরা ভেবেছি, যদি ২০ বছর সময় পাই, তাহলে আমরা বাংলাদেশে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারব।
সাহায্য ও পুনর্বাসন নিয়ে যখন কাজ করছিলাম, তখন কেউ কেউ আমাকে প্রশ্ন করছিল, এ কাজের জন্য এত এমএ পাস লোক নিচ্ছেন কেন? এ কাজ তো এসএসসি পাস লোকই করতে পারে। আমি বলেছি, না, আমি চাচ্ছি এমএ পাস লোকগুলো গ্রামে-গঞ্জে ত্রাণ দিয়ে গ্রাম সম্পর্কে একটা ধারণা পাক। এরা তো পরে আমার ম্যানেজার হবে। মাঠপর্যায় থেকে আস্তে আস্তে ওপরে নিয়ে আসব। ইচ্ছা ছিল, এমএ পাস ছেলেদের দিয়ে যদি একটা ক্যাডার তৈরি করতে পারি, যারা গ্রামের দরিদ্র লোকদের চেনে, তাহলে আমার সংগঠনটি আস্তে আস্তে বড় হতে পারবে।
ব্র্যাকের ইতিহাস লিখতে গেলে এত অল্প পরিসরে হয়তো হবে না। তা ছাড়া ব্যাকের নিজস্ব প্রকাশনা অনেক ব্যাপক। তা থেকে আমরা জেনে নিতে পারি অনেক কিছুই। তার চেয়ে চলুন, মানুষ ফজলে হাসান আবেদের সঙ্গে কথা বলি আরও কিছুক্ষণ—
দেয়ালে বাংলাদেশের শিল্পীদের চিত্রকর্ম। তাকে তাকে রাখা সম্মান আর পুরস্কার অর্জনের সাক্ষর। ব্র্যাক সেন্টারে নিজের সভাকক্ষে বসে কাচের জানালা দিয়ে দূরে নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে জীবনের আদর্শ হিসেবে দুটো মানুষের কথা বললেন হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচংয়ে জন্ম নেওয়া মানুষটি। যাঁর পূর্বপুরুষ ছিলেন সেই অঞ্চলের জমিদার। বললেন, মা সৈয়দা সুফিয়া খাতুন আর ছোট চাচা শহীদ সায়ীদুল হাসানের কথা।
‘আমার মা ছিলেন দরদি মনের। দয়ালু মানুষ। হয়তো খবর পেলেন কারও ঘরে খাবার নেই কিংবা আলো জ্বালাবার কেরোসিন নেই, মা ঠিক পাঠিয়ে দিতেন। আমার এই কাজের প্রেরণা মায়ের কাছ থেকেই হয়তো পেয়েছি। ভাইবোনদের মধ্যে সবচেয়ে কালো ছিলাম আমি। কালো ছেলেটাকে মা হয়তো একটু বেশিই ভালো বাসতেন। আমার বাবা সিদ্দিক হাসান ছিলেন বাবা-ই। অভিভাবক। কিন্তু আমার ছোট চাচা ছিলেন আমার চিন্তাবন্ধু। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যায় অনার্স পড়ছিলাম। ছোট চাচা তখন লন্ডনে পাকিস্তান দূতাবাসের বাণিজ্যসচিব। তাঁর পরামর্শে স্কটল্যান্ডে গিয়ে গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ে নেভাল আর্কিটেকচারে ভর্তি হলাম। উত্তেজনা ভেতরে, দেশের প্রথম নেভাল আর্কিটেক্ট হব। কিন্তু যখন বুঝলাম, দেশে ফিরে এই পড়াশোনা কাজে লাগবে না, তখন মাঝপর্যায়ে লন্ডনে ফিরে অ্যাকাউন্টিংয়ে ভর্তি হলাম। বাবা মানতে চাননি। কিন্তু ছোট চাচা বললেন, “তুমি যেটা চাও, তাই কর।” কবিতার প্রতি টান বা ভালোবাসাটাও ছোট চাচার কাছ থেকে পেয়েছি। তখন বয়স সাত-আট বছর। ভাইবোনদের মধ্যে নজরুলের কবিতা বা রবীন্দ্রনাথের সোনার তরী মুখস্থের প্রতিযোগিতা দিতেন ছোট চাচা। আমি বরাবর প্রথম হতাম।’
আপনাকে নিয়ে লেখা একটি বইয়ে পড়ছিলাম, আপনি যে বাড়িটায় থাকেন, সেটা ব্র্যাকের বাড়ি। আপনার সন্তানেরা এটার উত্তরাধিকারী নয়।
নিজেকে নিয়ে যখন লোকে খুব বেশি ব্যস্ত হয়ে যায়, তখন অন্যের জন্য কাজ করার ক্ষেত্রে মনোযোগ কমে যায়। কাজেই আমি প্রথম থেকেই চিন্তা করেছি নিজের জন্য কোনো সম্পত্তি করব না, জমিজমা করব না। আমার এক বন্ধু ছিল সেও এটা মানত। ‘এক বাক্সের মধ্যে যা আঁটে, সেটাই তার সম্পত্তি।’ সে ছিল আমেরিকান। সে মারা গেছে। ঢাকা থেকে যখন সে চলে গেছে, তখন কিছুই সে নিয়ে যায়নি। সব দিয়ে চলে গেছে। আমিও সেই নীতিতেই আছি। কোনো ধরনের সম্পত্তির দরকার নেই।
সন্তানেরা এটা মেনে নিয়েছে?
সন্তানেরা ছোটবেলা থেকেই এটা দেখছে, মেনে নিয়েছে। তবে আমি মনে করি, সন্তানদের প্রতি আমার একটা দায়িত্ব আছে। সেটা আমি পালন করেছি। অনেক সময় আমি নিজে টাকা দিতে পারিনি, আত্মীয়েরা টাকা দিয়েছে। ছেলে শামেরন আবেদ ব্যারিস্টারি পাস করে এসেছে। প্রথমে যোগ দিয়েছিল নিউ এজে। এখন আছে ব্র্যাকে। মেয়ে তামারা আবেদ আড়ং দেখছে।
তারা বাবাকে সমালোচনা করে না?
সব সময়ই সমালোচনা করে। আমার সমালোচনা করার জন্য ওই দুজনই আছে।
সন্তানদের কথা শোনেন?
অবশ্যই শুনি। কথামতো যে চলি, তা না, কিন্তু শুনতে তো অসুবিধা নেই।
আর বন্ধুদের কথা?
বন্ধু তো অনেক। বিদেশি বন্ধু আছে অনেক। যাঁরা ১৯৭২ সাল থেকে এখনো আছেন। এই যেমন হার্ভার্ডের অধ্যাপক রিচার্ড ক্যাশ। তিনি ১৯৭২ সালে আমাদের সঙ্গে কাজ করেছেন। এসেছিলেন অন্য সংগঠনের পরিচালক হয়ে। ১৯৬৭ সাল থেকেই তাঁর সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব। আইসিডিডিআরবিতে কাজ করতেন। ওখানে পানিশূন্যতা ও খাবার স্যালাইন আবিষ্কার করেছেন যাঁরা, তিনি তাঁদের মধ্যে একজন। তিনি বিজ্ঞানী। এখনো তিনি এসে আমাদের স্কুল অব পাবলিক হেলথে পড়ান। তিনি ৪০ বছর ধরে আমাদের বিভিন্ন স্বাস্থ্য প্রকল্পে সহায়তা দিচ্ছেন। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছেন। হার্ভার্ডেও পড়ান। তিনি মার্কিন। কোল্ড পি. ডজ বলে একজন আছেন, যিনি এখানে ইউনিসেফের প্রতিনিধি ছিলেন। তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ১৯৭৪ সালে। তখন তিনি অক্সফামের পরিচালক হিসেবে বাংলাদেশে এসেছিলেন। পরিচয় হয়, বন্ধুত্ব হয়। এখন তিনি অবসর নিয়েছেন ইউনিসেফ থেকে। এখনো প্রতিমাসে তিনি আসেন। ব্র্যাকের জন্য বিভিন্ন কাজ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা একজন অর্থনীতি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান চাই। তিনি বলেন, আমি নিউইয়র্কে গিয়ে দেখি বাংলাদেশের ভালো কেউ আছেন কিনা। আরও অনেক আছে। বাংলাদেশি তো আমাদের সংগঠনে অনেকেই কাজ করেছেন। ইশতিয়াক আহমেদ, আমাদের আইনজীবী ছিলেন। তিনি অনেক রকম কাজ করেছেন। ড. কামাল হোসেন আমাদের অনেক রকম আইনি সহায়তা দিয়েছেন। আমার বন্ধু ছিলেন সালমা সোবহান। তাঁর সঙ্গে মিলে আমরা আইন ও সালিশ কেন্দ্র সংগঠনটিও করি। আমি একসময় তার চেয়ারম্যানও ছিলাম।
জীবনে কি কখনো কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছেন? যদি ভুল হয়, তখন কি করেন?
ভুল হয়েছে বুঝতে পেরে প্রথমেই সেটা স্বীকার করে নিই। ভুল থেকে কিছু শিখি। ভুল হয়ে গেলে যে পরাজিত হয়ে গেলাম, সেটা আমি মনে করি না। একবার আমি চিন্তা করলাম, সারা দেশে ২৫ মিলিয়ন গাছ লাগিয়ে আমি সে আয় দিয়ে প্রায় আড়াই লাখ নারীকে রেশম পোকা পালার কাজ দেব। কিন্তু এই যে ২৫ মিলিয়ন গাছ লাগানো হলো, পরপর দুই বছরের বন্যায় সব নিঃশেষ হয়ে গেল। তখন আমার মনে হলো, চিন্তাভাবনা না করে এত গাছ লাগালাম, এত টাকা খরচ করলাম, ১৩ হাজার মহিলা ১৩ হাজার কিলোমিটার রাস্তা পাহারা দিল, কিন্তু প্রকল্পটিতে লোকসান হলো, তো তখন মনে হলো এ রকম একটা বড় প্রকল্প নেওয়ার আগে কতগুলো ছোট ছোট ‘পাইলট প্রকল্প’ নেওয়া উচিত ছিল। ফাস্ট বি এফেক্টিভ, দেন বি এফিশিয়েন্ট, দেন স্কেল আপ অর এক্সপান্ড।
আপনি বলেছেন, আপনার রাজনীতিতে আসার ইচ্ছে নেই, তাই কি?
একেবারেই নেই।
তবুও ধরুন, যদি আপনাকে রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালন করতে হয়, দেশের কোন ক্ষেত্রে আপনি সবার আগে নজর দেবেন?
প্রথমেই শিক্ষা।
আমাদের সংস্কৃতি নিয়ে আপনার কিছু ভিন্ন ভাবনা আছে।
আমার চিন্তাভাবনা একটু অন্য। আমি ব্যাখ্যা করি। রবীন্দ্রনাথকে আমরা ভালোবাসি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে পড়ে, বুঝে চিন্তা করার লোক, আনন্দ পাওয়ার লোক কত শতাংশ আছে বাংলাদেশে? নিরক্ষর বাঙালি তো বেশি। যত দিন পর্যন্ত বাংলার প্রতিটি মানুষ সংস্কৃতির আওতায় না আসবে, তত দিন পর্যন্ত এই সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে, যেন শিক্ষিত হয়। আমি চিন্তা করেছিলাম, আমাদের এক গাড়ির চালক, ষষ্ঠ শ্রেণী পাস, সামান্য পড়াশোনা পারে, তাদের জন্য বই প্রকাশ করব। রবীন্দ্রনাথের কাব্য, মধুসূদনের কাব্য, শরত্চন্দ্রের উপন্যাস, যত ক্লাসিক আছে, তা সহজ ভাষায় প্রকাশ করব। ৫০টি বই প্রকাশও করেছি। বাংলাদেশে ক্ল্যাসিক, বোঝে তো মাত্র পাঁচ শতাংশ মানুষ। কিসের সংস্কৃতিমনা বাঙালি? যদি বলি, বাংলাদেশের অর্ধেকের বেশি লোক এসব নিয়ে কিছুই জানে না? তাই আমি জনসংখ্যার একটা ছোট অংশ নিয়ে গর্ব করতে চাই না। যত দিন পর্যন্ত এটা না ছড়াবে, তত দিন পর্যন্ত আমি বাঙালির সংস্কৃতি বিষয়ে সন্দিহান। বাঙালি সংস্কৃতি একটি ছোট গন্ডির মধ্যে থাকবে আর তারা দম্ভ করে বলবে, আমরা সংস্কৃতিবান! নিজেদের মধ্যেই বুদ্ধিজীবী হয়ে আমরা খুশি থাকব! আমরা নাটক করছি, ধনীর সন্তানদের জন্য পাপেট শো করছি, গরিবের সন্তান যে পড়তেই পারছে না, তা নিয়ে কারও চিন্তা নেই। আমাদের সাংস্কৃতিক আন্দোলনটা এখনো অভিজাত শ্রেণীর হাতে। এ জন্য আমি তাদের সংস্পর্শে যাই না, আমি আমার কাজ করে যাই। আমি স্কুলে শিক্ষা দেব আগে। আমরা ১৯০০ লাইব্রেরি করেছি, এই পাঠাগারগুলোয় হারমোনিয়াম-তবলা দিয়েছি। আমি প্রত্যেকটি বাচ্চাকে সংগীতের অভিজ্ঞতা দিতে চাই।
কার গান ভালো লাগে?
রবীন্দ্রসংগীতের ওপর তো কিছু হয় না। দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া গান ভালো লাগে। পশ্চিমা সংগীত ভালো লাগে।
কখন গান শোনেন?
আমি সবসময়ই গান শুনতে ভালোবাসি। কাজের ঘরেও শুনি, বাড়িতেও শুনি। গানের আসরেও যাই।
মন খারাপ হলে কী করেন?
বই পড়ি। কবিতা পড়ি। কবিতা আমাকে অনেক ভালো রাখে।
গোপন একটা কবিতার খাতা কি আপনার নেই?
উঁচুদরের কবিতা পড়ছি আর নিচুদরের কবিতা লিখছি, সেটা হবে না। আমি যখন দেখলাম, আমার কবিতার সেই মেধা নেই-ই, তখন বুঝলাম অন্যরাই কবিতা লিখুক। আমি বরং পড়ি

February 27, 2010 Posted by | Uncategorized | Leave a Comment

প্রমিত বাংলা

টেলিভিশনের খবর দেখছিলাম। হঠাৎই একটা খবর কানে এল। তথ্য মন্ত্রণালয় গণমাধ্যমের কর্তাব্যক্তিদের এক পরামর্শসভায় ডেকেছে। তাতে গণমাধ্যমগুলোকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বাংলা ভাষার বিকৃতি রোধে ভূমিকা রাখতে। জগাখিচুড়ি ভাষা, অশুদ্ধ ভাষা প্রচারের মাধ্যমে ভাষার দূষণ যেন কেউ না ঘটায়। যদি কেউ এ ধরনের বিকৃতি ঘটাতেই থাকে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। টেলিভিশনে শোনা খবর স্মৃতি থেকে বললাম। ‘কঠোর ব্যবস্থা’র হুঁশিয়ারিটা স্পষ্ট মনে আছে। বাকি কথাগুলো হুবহু কী ছিল, তা ঠিকঠাক বলতে পারছি, এমন নয়। তবে অন্তর্নিহিত বার্তাটা এ রকমই।
বাংলা ভাষার প্রতি আমাদের যে গভীর মমত্ববোধ, সেটা খুবই খাঁটি একটা জিনিস, বানিয়ে তোলা কিছু নয়। তথ্য মন্ত্রণালয়ের এই উদ্যোগও সেই আন্তরিক ভালোবাসা, বেদনা ও উদ্বেগেরই প্রকাশ। তবে ধমক দিয়ে, পরামর্শ দিয়ে বা কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের হুমকি দিয়ে সৎ উদ্দেশ্যও চরিতার্থ হবে কি না, এ বিষয়ে সন্দেহ থেকেই যায়।
এ বিষয়ে গণমাধ্যমগুলোর নিজেকেই দায়িত্বশীল হতে হবে সবার আগে। গণমাধ্যমের কাজ কী— পাঠ্যপুস্তকে লেখা আছে—গণমাধ্যম তথ্য দেবে, বিনোদন দেবে, শিক্ষা দেবে, আর প্রেরণা জোগাবে। কাজেই শ্রোতা বা দর্শক বা পাঠককে সুশিক্ষা দেওয়া, উন্নতির পথে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করার দায় প্রতিটা গণমাধ্যমের ওপরে আপনাআপনিই বর্তায়। আর সেই দায়িত্ব গণমাধ্যমকে নিজের গরজে, নিজের দায়বোধ থেকেই করতে হয়। সরকার খবরদারি করে সেটা করতে পারবে বলে মনে হয় না। এটা সরকারের কাজও নয়। সৃষ্টিশীলতার কাজে সরকারের সব চেয়ে ভালো ভূমিকা হলো সবচেয়ে কম জড়িত হওয়া, কম হস্তক্ষেপ করা।
গণমাধ্যম তার নিজের ওপরে অর্পিত পাবলিক ট্রাস্টের দায় এড়াতে পারে না। আমাদের বেতারের উপস্থাপকেরা মান বাংলায় কথা বলতে জানবেন, প্রমিত কথ্যভাষা বলায় তাঁরা হয়ে উঠবেন একেকজন আদর্শ, এটা বেশ জোরের সঙ্গেই আমরা দাবি করতে পারি। এবিসি রেডিওতেও যথাসম্ভব প্রমিত বাংলা ব্যবহার করা হয় ও ইংরেজি শব্দ পরিহার করা হয়, কিন্তু তাতে এই বেতারটির জনপ্রিয়তা কমেনি, বরং খুবই অল্প সময়ের মধ্যে বেতারটি শ্রোতাদের মনে একটা স্থান অধিকার করে নিতে পেরেছে। প্রথম আলোরও সম্পাদকীয় নীতি হলো, ইংরেজি শব্দ পারতপক্ষে ব্যবহার না করা। কই, প্রথম আলোর জনপ্রিয়তা তো কমেনি, বরং প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। গণমাধ্যম কর্তৃপক্ষকে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। যখন একজন উপস্থাপক নেওয়া হয়, তখন তাঁকে পরীক্ষার মাধ্যমে বাছাই করে নিশ্চিত হতে হবে যে, তিনি মান বাংলাটা সঠিকভাবে বলতে পারেন। একই কথা টেলিভিশন চ্যানেলের জন্যও প্রযোজ্য। অনেকগুলো অনুষ্ঠান, বিশেষ করে ব্যান্ডের গানের অনুষ্ঠানের উপস্থাপকেরা বাংলা বলেন, নাকি হিন্দি বলেন, নাকি ইংরেজি বলেন, বোঝা খুবই দুষ্কর। আর এত ইংরেজি শিরোনামের অনুষ্ঠানই বা কেন?
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তথ্য মন্ত্রণালয় বা সরকারের কোনো মন্ত্রণালয় এগুলোকে পাহারা দিয়ে রাখতে পারবে কি না? এটা তার কাজ কি না? কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়াটা মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে কি না! আমরা গণমাধ্যমের নিরঙ্কুশ স্বাধীনতার পক্ষে এবং সরকারের ন্যূনতম হস্তক্ষেপেরও বিরুদ্ধে। আমেরিকা পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ। ওই দেশের সংবাদমাধ্যমে কোনো ধরনের সরকারি হস্তক্ষেপ সাংবিধানিকভাবে নিষিদ্ধ। ইউনাইটেড স্টেটস ইনফরমেশন এজেন্সি প্রকাশিত আনফেটারড প্রেস গ্রন্থে বলা হয়েছে, ‘একটা সংবাদপত্রের অধিকার আছে ছিদ্রান্বেষী, দলীয় পক্ষপাতদুষ্ট, অথবা অসত্যবাদী, সংকীর্ণতাবাদী, অথবা যা খুশি তাই হওয়ার, যা তার বিবেক তাকে হতে বলে।’ (পৃষ্ঠা ৩৫)। আমেরিকায় একটা সংবাদমাধ্যম মিথ্যা কথা বলারও অধিকার রাখে। কেন তারা সংবাদমাধ্যমকে এই স্বাধীনতা দিয়েছে? না হলে সরকার খবরদারি করবে, বলবে তুমি মিথ্যা বলছ। সরকারি খবরদারির একটা অজুহাত তৈরি হবে মাত্র। সেটা সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করবে। তার বদলে পাঠক সিদ্ধান্ত নিক, কোনটা সত্য কোনটা মিথ্যা। মিথ্যা কথা বলে কোনো সংবাদমাধ্যম শেষতক গ্রহণযোগ্যতা পায় না। তো এই অবাধ স্বাধীনতা দিয়ে আমেরিকা কি তার রাষ্ট্রটাকে ধ্বংস করে দিয়েছে? নাকি তারাই আজ পৃথিবীর এক নম্বর শক্তি হিসেবে টিকে আছে?
তার পরের প্রশ্ন হলো, কোনটা প্রমিত কোনটা প্রমিত নয়, এটা ঠিক করবে কে? ভাষা তো বহমান একটা জিনিস, এটা স্থির নয়। আজ যাকে প্রমিত বলছি, ১০০ বছর আগে সেটা প্রমিত ছিল না, ১০০ বছর পরেও থাকবে না। প্রমথ চৌধুরী বলেছেন, ‘ভাষা মানুষের মুখ হতে কলমের মুখে আসে, কলমের মুখ হতে মানুষের মুখে নয়। উল্টোটা করতে গেলে মুখে শুধু কালি পড়ে।’ (প্রমথ চৌধুরী, কথার কথা, প্রবন্ধসংগ্রহ)। আমি লেখার সময় বাংলা একাডেমীর প্রমিত বানান অভিধান মেনে চলি, কিন্তু বাংলাদেশের বহু গুরুত্বপূর্ণ লেখক আছেন, যাঁরা ওই বানানরীতি মানেন না। তাঁদের কি আমরা বলতে পারব, আপনারা আইন লঙ্ঘন করছেন? বানানের ক্ষেত্রেই যদি আমরা বাংলা একাডেমীর প্রমিত বানান অভিধান সবাইকে মানতে বাধ্য করতে না পারি, তাহলে উচ্চারণের ক্ষেত্রে কীভাবে পারব? প্রমিত বাংলা নষ্ট হয়ে যাবে, এই ভয়ে কি আমরা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের চরমপত্র পাঠ নিষিদ্ধ করে দেব? অথচ ওইটাই ছিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় অনুষ্ঠান! আমরা কি বেতারে কি টেলিভিশনে ভাওয়াইয়া-ভাটিয়ালি-লালন-হাসন প্রচার করব না! আমরা কি সাতই মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণের ‘দাবায়া রাখতে পারবা না’ বাক্যটাকে সম্পাদিত করে ‘দাবিয়ে রাখতে পারবে না’ করতে বলব? অসম্ভব। আমরা কি টেলিভিশন নাটক নির্মাণের সময় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মানদীর মাঝির সংলাপ বা দীনবন্ধু মিত্রের নীলদর্পণ নাটকের সংলাপ বদলে প্রমিত মান বাংলা করে দেব? আবার আমাদের সংবিধান লেখা সাধু ভাষায়, আমরা কি তাহলে সাধু ভাষাকে প্রমিত ভাষা ধরে নিয়ে বেতার-টেলিভিশনে সাধু ভাষা বাধ্যতামূলক করব? রবীন্দ্রনাথের একটা গল্প ‘ল্যাবরেটরি’ থেকে তিনটা বাক্য উদ্ধৃত করি, খেয়াল করে দেখুন তিনি কত ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করেছেন, ‘নন্দনকিশোর ছিলেন লন্ডন য়ুনিভার্সিটি থেকে পাস করা এঞ্জিনিয়ার। যাকে সাধুভাষায় বলে দেদীপ্যমান ছাত্র, অর্থাত্ ব্রিলিয়ান্ট, তিনি ছিলেন তাই।…এসব দেনা-পাওনা নাকি কোম্পানি নামক একটা অ্যাব্স্ট্রাক্ট সত্তার সঙ্গে জড়িত…।’ এখন রবিবাবুর এই গল্পকে জগাখিচুড়ি ভাষা বলে আমরা বাতিলের খাতায় পাঠাতে পারব কি?
তাই বলি, প্রথমেই একটা সীমারেখা টানতে হবে। তা হলো, সৃজনশীল এলাকা আর আনুষ্ঠানিক এলাকা। শিল্পী-সাহিত্যিক-নাট্যকারেরা স্বাধীনভাবে লিখবেন। একটা বেতার বা টেলিভিশন বা সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় নীতি বলে দেবে, এটা তারা প্রকাশ বা প্রচার করতে পারবে কি না। যেমন হাসান আজিজুল হক একটা অপূর্ব উপন্যাস লিখেছেন আগুনপাখি নামে। এটা প্রথম আলোর বর্ষসেরা বইয়ের পুরস্কার পেয়েছে এই বাংলাদেশে, পশ্চিমবঙ্গে পেয়েছে আনন্দ পুরস্কার। বইটা লেখা হয়েছে রাঢ় অঞ্চলের কথ্য ভাষায়। ‘আমার মায়ের য্যাকন মিত্যু হলো আমার বয়েস ত্যাকন আট-ল’ বছর হবে। ভাইটোর বয়েস দেড়-দু বছর। এই দুই ভাই-বুনকে অকূলে ভাসিয়ে মা আমার চোখ বুজল। ত্যাকনকার দিনে কে যি কিসে মরত ধরবার বাগ ছিল না।’ পুরো বইটার বর্ণনা এই ভাষায়। এটাকে তো আপনি প্রমিত নয় বলে নিষিদ্ধ করে দিতে পারেন না।
আমরা কি টেলিভিশনে পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়, নূরলদীনের সারাজীবন বা হাতহদাই প্রচারে বাধা দেব? নাটকের সংলাপ হবে চরিত্রানুগ, সেটা দীনবন্ধু মিত্রও লিখেছেন, মধুসূদন দত্তও লিখেছেন, সেটা নিয়ে কোনো বিতর্ক কখনো ছিল না, আশা করি এখনো নাই। আবার সৃষ্টিশীল লেখক তাঁর বর্ণনার ভাষাও নিজের মতো করে তৈরি করে নিতে পারেন, আঞ্চলিক ভাষায় লিখতে পারেন—আইন করে সেটাকে ঠেকানোর কথা কেউ কল্পনাও করে না।
কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে যখন আমরা বেতারে বা টেলিভিশনে কথা বলব, শ্রেণীকক্ষে বা আলোচনা সভায় বক্তৃতা করব, আমরা তখন প্রমিত কথ্য ভাষা ব্যবহারের চেষ্টা করব ১০০ ভাগ। সেখানে যখন অন্যথা দেখি, আমরা আমাদের উদ্বেগের কথা নিশ্চয়ই জানাব। আমাদের কোনো পরামর্শ থাকলে সেটা দেবও। আমরা চাইব, আমাদের সংবাদপাঠকেরা প্রমিত বাংলায় খবর পরিবেশন করবেন। আমরা চাইব আমাদের আলোচনা অনুষ্ঠানগুলোর আলোচকেরা মান বাংলায় আলোচনা করবেন। কিন্তু সেটাও পাহারা দিয়ে রাখা মুশকিল। আমরা কি আমাদের জাতীয় সংসদের মাননীয় স্পিকার আবদুল হামিদের সংসদে বলা উক্তিগুলো প্রচার করব না? নিশ্চয়ই করব। অসাধারণ দক্ষতায় তিনি সংসদ পরিচালনা করেন এবং তাঁর মুখের কথা শুনতে আমাদের ভালো লাগে।
বলতে চাচ্ছি, এটা অসম্ভব যে কোন বেতারে, কোন টেলিভিশনে, কোন সংবাদপত্রে দূষণীয় ভাষা পরিবেশিত হচ্ছে, সরকারের পক্ষে তা পাহারা দিয়ে রাখা, তা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা। এ ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমকেই যথেষ্ট দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। যে যত জনপ্রিয় হবে, তাকে তত বেশি দায়িত্বশীল হতে হবে। এমনকি শিল্পীরও দায়িত্ব আছে। দায়বদ্ধতা আছে। শিল্পী নিশ্চয়ই এ বিষয়ে সচেতন হবেন।
প্রমিত বাংলা আমাদের শিখতে হবে। আমরা শুদ্ধ বাংলা বলতে ও লিখতে পারার কষ্টটা স্বীকার করব না, এটা খুব কাজের কথা নয়। আমাদের স্কুলগুলোকে, আমাদের নাগরিকদেরকে এ ব্যাপারে দায়িত্ব পালন করতে হবে। পাশাপাশি এটাও বলি, আঞ্চলিক ভাষা বাংলা ভাষার শত্রু নয়, আঞ্চলিক ভাষা বাংলার প্রধান সম্পদ। এটাকে যেন আমরা অবহেলা না করি, আঞ্চলিক ভাষায় যাঁরা কথা বলেন, তাঁদের যেন আমরা হেয় না করি। আমাদের যেন আবার লিখতে না হয়, ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়।’ একুশের চেতনা মানে বহুস্বরের চেতনা, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের চেতনা আমাদের ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর ভাষাগুলোকেও গুরুত্ব ও মর্যাদা দেওয়ার চেতনা। সংস্কৃতি মানে কেবল কেন্দ্রের বা মধ্যবিত্তের স্বর নয়, শাসক শ্রেণীর স্বর নয়; প্রান্তেরও স্বর, শত ফুল ফুটতে দেবার সাধনা, গরিব মানুষ, কৃষক-শ্রমিক মেহনতি মানুষের কণ্ঠস্বরও যেন আমাদের শিল্প-সাহিত্য-গণমাধ্যমে স্থান পায়। আমরা যেন কথায় কথায় হাতে-পায়ে শেকল পরানোর ভুল চেষ্টা না করি।
বাংলা ভাষার প্রধান শত্রু কে? আমাদের আঞ্চলিক ভাষাগুলো মোটেও নয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ যে বিভিন্ন উপভাষায় কথা বলেন, সেসবের বদলে রাষ্ট্র একটা কেন্দ্র-নির্দেশিত ভাষা প্রবর্তন করবে, এই চিন্তার মতো স্বৈরাচারী ও একুশের চেতনাবিরোধী আর কিছুই হতে পারে না। বাংলা ভাষার প্রধান শত্রু বিশ্বায়নের চাপে মুক্তবাজারের খোলা দরজা-জানালা দিয়ে ঢুকে পড়া পণ্যবাদী সংস্কৃতির আগ্রাসন। সরকারের এসব ক্ষেত্রে করার আছে অনেক কিছু। একবার এই দেশে আইন করা হয়েছিল, অফিস-আদালত, দোকানের নামফলক বাংলায় লিখতে হবে। সাইনবোর্ডে বাংলা থাকতে হবে, এই আইনটা যদি থেকে থাকে, তাহলে সেটাকে পুরোপুরি কার্যকর করা হোক, যদি না থাকে, তাহলে এই আইন আবার চালু করতে হবে। বাংলা ভাষার আরেকটা বড় শত্রু অবশ্যই হিন্দি টেলিভিশন চ্যানেলগুলো। আমাদের মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো আর বাংলাদেশের চ্যানেল দেখে না। তথ্য মন্ত্রণালয় যদি সত্যি সত্যি বাংলা ভাষার জন্য একটা কিছু করতে চায়, তাহলে তার প্রথম কাজ হওয়া উচিত এই দেশে হিন্দি চ্যানেলের ওপরে বিধিনিষেধ আরোপ করা। এটা ভীষণ অজনপ্রিয় একটা পদক্ষেপ হবে, কারণ আমরা এই হিন্দি ধারাবাহিকগুলোতে মাদকের মতো নেশাসক্ত হয়ে পড়েছি। শিশুদের একটা হিন্দি চ্যানেলে হিন্দি কার্টুন দেখানো হয়, ওর দ্বারা শিশুরা বাংলা বলা ভুলে যাচ্ছে। এটা অবিলম্বে বন্ধ করে দেওয়া উচিত। আমাদের ভোগ্যপণ্যগুলোর মোড়কে বাংলা লেখা থাকা বাধ্যতামূলক করা যায়। আমাদের বিজ্ঞাপনচিত্রে ইংরেজির ব্যবহার সহজেই বন্ধ করে দেওয়া যায়। এসব পদক্ষেপ যদি তথ্য মন্ত্রণালয় গ্রহণ করে, বাংলা ভাষার ভীষণ উপকার হবে। অফিস-আদালতে বাংলা ব্যবহারের সাংবিধানিক অঙ্গীকার পালনে আন্তরিক হতে হবে সরকারকেই। প্রথম আলো ২০১০ একুশে সংখ্যায় মিশা হোসেন একটা চমত্কার প্রবন্ধ লিখেছেন, আজকে দেশের মানুষ ইংরেজি জানা ও ইংরেজি না জানা এ দুই শ্রেণীতে ভাগ হয়ে যাচ্ছে। বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। একুশের চেতনা হলো বৈষম্যহীনতা, রাষ্ট্রকে এই বৈষম্য বিলোপে কাজ করতে হবে। আমাদের ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়গুলোয় ভারতের ইতিহাস পড়ানো হয়, ব্রিটেনের ইতিহাস পড়ানো হয়, তাদের বাংলার ইতিহাস পড়াতে হবে। সেসব না করে রাষ্ট্র যদি বহু মানুষের কণ্ঠস্বরকে সংস্কৃতিতে আসতে বাধা দেয়, তা হবে পণ্ডশ্রম, তা আমাদের মনে করিয়ে দেয় শহীদ কাদরীর কবিতা, ‘রাষ্ট্র মানেই লেফ্ট রাইট লেফ্ট রাইট।’ একুশের চেতনা এ রকম লেফট রাইট মার্কা রাষ্ট্র নয়, একটা বৈষম্যহীন উদার অসাম্প্রদায়িক সুখী আলোকিত মুক্ত রাষ্ট্র—যে রাষ্ট্রে বর্ণমালা যাবে প্রতিটা ভূমিহীনেরও ঘরে, ভূমিহীনের কণ্ঠস্বরও ধ্বনিত হবে জাতীয় গণমাধ্যমে।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক, সাংবাদিক।

প্রথম আলো ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০১০

February 23, 2010 Posted by | Uncategorized | Leave a Comment

   

Follow

Get every new post delivered to your Inbox.